ঢাকা ০২:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬

ড. ইউনূস সরকারের বিদায়: স্বস্তিতে দিল্লি, নতুন সমীকরণের প্রত্যাশা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৩৬:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল সমাপ্ত করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দিল্লিতে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিদায়কে ভারতের নীতিনির্ধারকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো যে খুব সহজে সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।

দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই খুশি ভারত। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মোদি সরকার। তবে ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক খবর হলো, ঢাকার মসনদে আর ড. ইউনূসকে দেখা যাবে না। গত ১৮ মাস বিভিন্ন ইস্যুতে দিল্লিকে ঢাকার পক্ষ থেকে যেভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল, সেই অধ্যায়ের এখন সমাপ্তি ঘটেছে বলে মনে করছেন ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের আগমনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো খুব সহজে সমাধান করা যাবে না। দিল্লি তার হারানো প্রভাব আবার ফিরে পেতে চাইবে এবং আওয়ামী লীগকে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষাসহ বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে ভারত ঠিক কতটা আন্তরিকতা দেখাবে—সেটা এক বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে। এছাড়া শেখ হাসিনা ইস্যুটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উল্লেখ্য, জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্যবাদেরও এক ধরনের অবসান ঘটে বলে অনেকে মনে করেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে দিল্লি জানিয়ে দিয়েছে তারা জুলাই বিপ্লব এবং বিপ্লব-পরবর্তী ড. ইউনূস সরকারকে মেনে নেয়নি। ১৮ মাসের ড. ইউনূসের শাসনামলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে হস্তক্ষেপের পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য অব্যাহতভাবে অপচেষ্টা চালিয়েছে ভারত। সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে ভারতীয় নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সে দেশের গণমাধ্যমগুলো অব্যাহতভাবে প্রচার চালিয়েছে। চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দেওয়ার। শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যের অডিও রেকর্ড একের পর এক ফাঁস করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভারত সরকারের ইন্ধনে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা চালিয়েছে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের ভিসা সেন্টার। নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে নামানো হয়েছিল শেখ হাসিনাকে, যিনি সন্ত্রাসবাদ উসকে দেওয়ার মাধ্যমে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই দমানো যায়নি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। বরং কীভাবে চোখে চোখ রেখে দিল্লিকে মোকাবেলা করা যায়, সেই উদাহরণ সৃষ্টি করে রেখে গেছেন তিনি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। এই সময়ে ড. ইউনূস দিল্লিকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে একমাত্র বৈঠকে ড. ইউনূস দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনার ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি ভারতকে সতর্ক করেন যে, বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হলে তার প্রভাব ভারতেও পড়বে। ভারতে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলার পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারতীয়দের জন্য ভিসা সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের মতো পদক্ষেপও নেয় ড. ইউনূস সরকার। তলানিতে থাকা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এছাড়াও বাংলাদেশবিরোধী ভারতীয় পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানাতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় দূতকে ১৮ মাসে অন্তত ছয়বার তলব করা হয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ইস্যুতে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে দিল্লিকে। তাই পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, ভারতের নীতিনির্ধারকরা অপেক্ষায় ছিল কখন ইউনূস সরকার বিদায় নেবে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ব্যাপারে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবর্তমানে ভারতের সামনে বিএনপি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়কে দিল্লির নীতিনির্ধারকরা একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ভারত সরকার নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোনে কথা বলেছেন এবং শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। ঢাকায় ভিসা সার্ভিস চালুর কথাও বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে দিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকাকে এক ধরনের ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি দিল্লির সমর্থন নিঃশর্ত হবে না।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা আরও বলেন, মোদি সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে বিভিন্ন থিংক ট্যাংক এবং ভারতের প্রধান গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশ বিষয়ে একই ধরনের মন্তব্য করছে। সবার একই প্রশ্ন, তারেক রহমান কি তার মা, অর্থাৎ খালেদা জিয়ার নীতি অনুসরণ করবেন, নাকি সেই নীতি থেকে বেরিয়ে আসবেন। দিল্লি মনে করে, খালেদা জিয়ার নীতির কারণে অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের উত্থানকে ভারত তার জন্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। দিল্লি চাইবে ইসলামপন্থিদের রাশ টেনে ধরুক তারেক রহমানের সরকার। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা চায় না শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণের ইস্যুটি বারবার আলোচনায় আসুক। এছাড়া যেকোনো ফর্মেই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনা, শেখ হাসিনার আমলে সই হওয়া চুক্তিগুলো বহাল রাখা ও কার্যকর করা, তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত পরিস্থিতি, সর্বোপরি গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়নসহ পানিবণ্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে দিল্লি চাপে রাখবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভবিষ্যৎ আচরণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান। তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় ভারত রীতিমতো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। ড. ইউনূস যেভাবে শক্ত হাতে দিল্লিকে মোকাবেলা করেছেন, তা অতীতে কেউ করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। ড. ইউনূস কোনো ধরনের ছাড় দেননি। তিনি বলেন, বর্তমানে ভারতের সামনে কোনো বিকল্প নেই, তাই তারা মিষ্টি কথা বলছে এবং অভিনন্দন জানাচ্ছে। তিনি ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, তারা তাদের তথাকথিত নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে আনবে এবং চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে এর সঙ্গে যোগ করবে, যা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অধ্যাপক শহীদুজ্জামান নতুন সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ভারত নিশ্চিতভাবেই চাইবে হাসিনার সময়ে করা চুক্তিগুলো বহাল থাকুক এবং তারা আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশে অন্য কারো শাসন মেনে নিতে পারে না। এছাড়াও জুলাই অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছে, সেই তরুণ প্রজন্ম কখনো দিল্লির আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি হবে ইস্যুভিত্তিক। তিনি বলেন, দিল্লি এখন নতুন সরকারের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। গত ১৮ মাস তারা একটি কঠিন সময় পার করেছে। এখন দুদেশের মধ্যে ইস্যুভিত্তিক আলোচনা শুরু হবে। তবে এই আলোচনাগুলো যে খুব সহজ হবে, তা বলা যাবে না। ভারত প্রথমে তাদের নিরাপত্তা ইস্যুতে জোর দেবে, কারণ শেখ হাসিনার আমলে নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লির কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। ভারত চাইবে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো কার্যকর থাকুক। অন্যদিকে গঙ্গাচুক্তি চলতি বছরই শেষ হচ্ছে এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ইস্যু তো আছেই। এছাড়াও বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা, সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো ইস্যুতে বাংলাদেশের কথা ভারত কতটা আন্তরিকতা দেখাবে, তা এক বড় প্রশ্ন। সুতরাং আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকবে বলেই তার ধারণা। সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার খালেদা জিয়ার ভারতনীতি অনুসরণ করছে কি না, এ মুহূর্তে সেদিকেই মূলত নজর রাখছে দিল্লির সাউথ ব্লক।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের চিকিৎসা কেন্দ্র প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ঢাবি প্রশাসন ও ডাকসুর পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

ড. ইউনূস সরকারের বিদায়: স্বস্তিতে দিল্লি, নতুন সমীকরণের প্রত্যাশা

আপডেট সময় : ০৮:৩৬:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল সমাপ্ত করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দিল্লিতে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিদায়কে ভারতের নীতিনির্ধারকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো যে খুব সহজে সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।

দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই খুশি ভারত। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মোদি সরকার। তবে ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক খবর হলো, ঢাকার মসনদে আর ড. ইউনূসকে দেখা যাবে না। গত ১৮ মাস বিভিন্ন ইস্যুতে দিল্লিকে ঢাকার পক্ষ থেকে যেভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল, সেই অধ্যায়ের এখন সমাপ্তি ঘটেছে বলে মনে করছেন ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের আগমনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো খুব সহজে সমাধান করা যাবে না। দিল্লি তার হারানো প্রভাব আবার ফিরে পেতে চাইবে এবং আওয়ামী লীগকে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষাসহ বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে ভারত ঠিক কতটা আন্তরিকতা দেখাবে—সেটা এক বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে। এছাড়া শেখ হাসিনা ইস্যুটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উল্লেখ্য, জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্যবাদেরও এক ধরনের অবসান ঘটে বলে অনেকে মনে করেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে দিল্লি জানিয়ে দিয়েছে তারা জুলাই বিপ্লব এবং বিপ্লব-পরবর্তী ড. ইউনূস সরকারকে মেনে নেয়নি। ১৮ মাসের ড. ইউনূসের শাসনামলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে হস্তক্ষেপের পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য অব্যাহতভাবে অপচেষ্টা চালিয়েছে ভারত। সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে ভারতীয় নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সে দেশের গণমাধ্যমগুলো অব্যাহতভাবে প্রচার চালিয়েছে। চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দেওয়ার। শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যের অডিও রেকর্ড একের পর এক ফাঁস করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভারত সরকারের ইন্ধনে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা চালিয়েছে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের ভিসা সেন্টার। নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে নামানো হয়েছিল শেখ হাসিনাকে, যিনি সন্ত্রাসবাদ উসকে দেওয়ার মাধ্যমে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই দমানো যায়নি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। বরং কীভাবে চোখে চোখ রেখে দিল্লিকে মোকাবেলা করা যায়, সেই উদাহরণ সৃষ্টি করে রেখে গেছেন তিনি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। এই সময়ে ড. ইউনূস দিল্লিকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে একমাত্র বৈঠকে ড. ইউনূস দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনার ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি ভারতকে সতর্ক করেন যে, বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হলে তার প্রভাব ভারতেও পড়বে। ভারতে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলার পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারতীয়দের জন্য ভিসা সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের মতো পদক্ষেপও নেয় ড. ইউনূস সরকার। তলানিতে থাকা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এছাড়াও বাংলাদেশবিরোধী ভারতীয় পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানাতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় দূতকে ১৮ মাসে অন্তত ছয়বার তলব করা হয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ইস্যুতে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে দিল্লিকে। তাই পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, ভারতের নীতিনির্ধারকরা অপেক্ষায় ছিল কখন ইউনূস সরকার বিদায় নেবে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ব্যাপারে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবর্তমানে ভারতের সামনে বিএনপি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়কে দিল্লির নীতিনির্ধারকরা একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ভারত সরকার নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোনে কথা বলেছেন এবং শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। ঢাকায় ভিসা সার্ভিস চালুর কথাও বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে দিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকাকে এক ধরনের ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি দিল্লির সমর্থন নিঃশর্ত হবে না।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা আরও বলেন, মোদি সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে বিভিন্ন থিংক ট্যাংক এবং ভারতের প্রধান গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশ বিষয়ে একই ধরনের মন্তব্য করছে। সবার একই প্রশ্ন, তারেক রহমান কি তার মা, অর্থাৎ খালেদা জিয়ার নীতি অনুসরণ করবেন, নাকি সেই নীতি থেকে বেরিয়ে আসবেন। দিল্লি মনে করে, খালেদা জিয়ার নীতির কারণে অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের উত্থানকে ভারত তার জন্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। দিল্লি চাইবে ইসলামপন্থিদের রাশ টেনে ধরুক তারেক রহমানের সরকার। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা চায় না শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণের ইস্যুটি বারবার আলোচনায় আসুক। এছাড়া যেকোনো ফর্মেই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনা, শেখ হাসিনার আমলে সই হওয়া চুক্তিগুলো বহাল রাখা ও কার্যকর করা, তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত পরিস্থিতি, সর্বোপরি গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়নসহ পানিবণ্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে দিল্লি চাপে রাখবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভবিষ্যৎ আচরণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান। তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় ভারত রীতিমতো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। ড. ইউনূস যেভাবে শক্ত হাতে দিল্লিকে মোকাবেলা করেছেন, তা অতীতে কেউ করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। ড. ইউনূস কোনো ধরনের ছাড় দেননি। তিনি বলেন, বর্তমানে ভারতের সামনে কোনো বিকল্প নেই, তাই তারা মিষ্টি কথা বলছে এবং অভিনন্দন জানাচ্ছে। তিনি ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, তারা তাদের তথাকথিত নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে আনবে এবং চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে এর সঙ্গে যোগ করবে, যা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অধ্যাপক শহীদুজ্জামান নতুন সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ভারত নিশ্চিতভাবেই চাইবে হাসিনার সময়ে করা চুক্তিগুলো বহাল থাকুক এবং তারা আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশে অন্য কারো শাসন মেনে নিতে পারে না। এছাড়াও জুলাই অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছে, সেই তরুণ প্রজন্ম কখনো দিল্লির আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি হবে ইস্যুভিত্তিক। তিনি বলেন, দিল্লি এখন নতুন সরকারের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। গত ১৮ মাস তারা একটি কঠিন সময় পার করেছে। এখন দুদেশের মধ্যে ইস্যুভিত্তিক আলোচনা শুরু হবে। তবে এই আলোচনাগুলো যে খুব সহজ হবে, তা বলা যাবে না। ভারত প্রথমে তাদের নিরাপত্তা ইস্যুতে জোর দেবে, কারণ শেখ হাসিনার আমলে নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লির কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। ভারত চাইবে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো কার্যকর থাকুক। অন্যদিকে গঙ্গাচুক্তি চলতি বছরই শেষ হচ্ছে এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ইস্যু তো আছেই। এছাড়াও বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা, সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো ইস্যুতে বাংলাদেশের কথা ভারত কতটা আন্তরিকতা দেখাবে, তা এক বড় প্রশ্ন। সুতরাং আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকবে বলেই তার ধারণা। সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার খালেদা জিয়ার ভারতনীতি অনুসরণ করছে কি না, এ মুহূর্তে সেদিকেই মূলত নজর রাখছে দিল্লির সাউথ ব্লক।