ঢাকা ১১:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ: টিআইবির গভীর উদ্বেগ, স্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুতর সংশয়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি প্রশ্ন তুলেছে, করপোরেট স্বার্থ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের ঊর্ধ্বে উঠে নবনিযুক্ত গভর্নর কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোয় এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে বলে টিআইবি জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে টিআইবি এই উদ্বেগের কথা জানায়। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, নতুন গভর্নরের ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রস্ততা, ঋণখেলাপি অবস্থা এবং পরবর্তীতে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিলের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পাশাপাশি তিনি তৈরি পোশাক শিল্প, আবাসন খাত, অ্যাটাব ও ঢাকা চেম্বারের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী লবির অংশ হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলে খাদে পড়া ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন গভর্নর ব্যবসায়ী লবি, ঋণগ্রস্ত ও ঋণখেলাপি মহলের প্রভাবমুক্ত থেকে কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, সংসদ সদস্যদের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং মন্ত্রিসভার ৬২ শতাংশের মূল পেশা ব্যবসা। এ ছাড়া প্রায় অর্ধেক সংসদ সদস্য ঋণগ্রস্ত। এই প্রেক্ষাপটে একজন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ী, যার বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিলের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যিনি তৈরি পোশাক শিল্প ও আবাসন খাতে নীতি দখলের সুবিধাভোগী, তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া ব্যাংক খাতের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা সরকারকে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

টিআইবি মনে করে, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হলো। এর মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী বার্তা যাচ্ছে, সেটিও সরকারের ভেবে দেখা উচিত। ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, সদ্য ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া কতটা বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত? তিনি দাবি করেন, ব্যাংক খাতের সুশাসন, শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে এ ধরনের নিয়োগ সাংঘর্ষিক।

টিআইবির ভাষ্য, অতীতে দলীয় বিবেচনা ও স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে ব্যাংক খাত ভঙ্গুর অবস্থায় পড়েছে; বেড়েছে খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা যখন জরুরি, তখন এ নিয়োগ কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে নতুন গভর্নর কতটা স্বাধীন ও নির্মোহ ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্য। টিআইবি মনে করে, নবনিযুক্ত গভর্নরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকার ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্বার্থের বাইরে গিয়ে কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে—তা এখন দেখার বিষয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সংসদে সংস্কার না হলে রাজপথে তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি বিরোধী দলের

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ: টিআইবির গভীর উদ্বেগ, স্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুতর সংশয়

আপডেট সময় : ০৮:৪৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি প্রশ্ন তুলেছে, করপোরেট স্বার্থ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের ঊর্ধ্বে উঠে নবনিযুক্ত গভর্নর কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোয় এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে বলে টিআইবি জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে টিআইবি এই উদ্বেগের কথা জানায়। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, নতুন গভর্নরের ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রস্ততা, ঋণখেলাপি অবস্থা এবং পরবর্তীতে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিলের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পাশাপাশি তিনি তৈরি পোশাক শিল্প, আবাসন খাত, অ্যাটাব ও ঢাকা চেম্বারের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী লবির অংশ হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলে খাদে পড়া ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন গভর্নর ব্যবসায়ী লবি, ঋণগ্রস্ত ও ঋণখেলাপি মহলের প্রভাবমুক্ত থেকে কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, সংসদ সদস্যদের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং মন্ত্রিসভার ৬২ শতাংশের মূল পেশা ব্যবসা। এ ছাড়া প্রায় অর্ধেক সংসদ সদস্য ঋণগ্রস্ত। এই প্রেক্ষাপটে একজন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ী, যার বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিলের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যিনি তৈরি পোশাক শিল্প ও আবাসন খাতে নীতি দখলের সুবিধাভোগী, তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া ব্যাংক খাতের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা সরকারকে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

টিআইবি মনে করে, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হলো। এর মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী বার্তা যাচ্ছে, সেটিও সরকারের ভেবে দেখা উচিত। ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, সদ্য ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া কতটা বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত? তিনি দাবি করেন, ব্যাংক খাতের সুশাসন, শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে এ ধরনের নিয়োগ সাংঘর্ষিক।

টিআইবির ভাষ্য, অতীতে দলীয় বিবেচনা ও স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে ব্যাংক খাত ভঙ্গুর অবস্থায় পড়েছে; বেড়েছে খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা যখন জরুরি, তখন এ নিয়োগ কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে নতুন গভর্নর কতটা স্বাধীন ও নির্মোহ ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্য। টিআইবি মনে করে, নবনিযুক্ত গভর্নরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকার ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্বার্থের বাইরে গিয়ে কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে—তা এখন দেখার বিষয়।