পবিত্র মাহে রমজান আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস। এই মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী একদিকে যেমন ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকেন, তেমনি সংসার, সন্তান লালন-পালন ও কর্মজীবনের দায়িত্বও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। ফলে এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা তাঁদের জন্য এক বিশেষ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সুস্থ দেহ ও প্রাণবন্ত মন না থাকলে একদিকে যেমন রোজার পবিত্রতা রক্ষা করা কঠিন হয়, তেমনি দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনেও দেখা দেয় অনীহা। তাই রমজানে নারীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চাই সচেতন পরিকল্পনা ও সুষম জীবনযাপন।
সুষম খাদ্যাভ্যাস: শক্তির উৎস
রমজানে নারীর সুস্থতার জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইফতার ও সাহরি এমনভাবে পরিকল্পনা করা উচিত, যা শরীরকে পর্যাপ্ত শক্তি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগান দেয়। ইফতারের শুরুতে খেজুর বা ফল খেলে শরীর দ্রুত শক্তি ফিরে পায়। এরপর হালকা স্যুপ বা সালাদ এবং পর্যাপ্ত পানি পান শরীরকে সতেজ ও হাইড্রেটেড রাখে। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন—ডিম, মাছ, দুধ বা হালকা মুরগির মাংস, সঙ্গে শাকসবজি গ্রহণ করলে শরীর দীর্ঘ সময় সতেজ থাকে। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত, প্রক্রিয়াজাত বা মিষ্টি খাবার পরিহার করা উচিত, কারণ এগুলো হজমের সমস্যা, গ্যাস ও ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
নারীর মাসিক চক্র ও হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে খাদ্য ও পানির ভারসাম্য রাখা অপরিহার্য। ইফতার থেকে সাহরির মধ্যবর্তী সময়ে পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ শরীরকে ক্লান্তি ও মাথা ঘোরা থেকে রক্ষা করে। সাহরিতে হালকা শাকসবজি, ওটমিল বা দানাশস্য, ডিম বা দুধের মতো প্রোটিন এবং কম চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে শক্তি দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে। ভারী ও তেলযুক্ত খাবার সাহরিতে পরিহার করা উচিত, যা শরীরকে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। সাহরি গ্রহণের পর সামান্য বিশ্রাম শরীরকে দিনের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
হালকা ব্যায়ামে সতেজ শরীর
শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে হালকা ব্যায়াম অপরিহার্য। রমজানে দিনের বেলায় ভারী ব্যায়াম বা দীর্ঘ সময়ের শারীরিক পরিশ্রম নারীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে হালকা হাঁটা, যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং শরীরকে সতেজ রাখে, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং পেশি ও হাড়কে শক্তিশালী করে। দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝে কিছু সময় হাঁটার জন্য বের হওয়া বা হালকা স্ট্রেচিং মনকেও সতেজ রাখে। ব্যায়াম দিনের শেষ ভাগে বা ইফতারের পর করা সবচেয়ে ভালো। এতে দেহে ক্লান্তি কমে, রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে এবং রাতে ঘুমও ভালো হয়।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম: ক্লান্তি দূর করে
ঘুম ও বিশ্রাম নারীর সুস্থতার অপরিহার্য অংশ। রমজানে ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তিত হলেও রাতে পর্যাপ্ত ঘুম এবং দিনের ছোট বিশ্রাম শরীরকে সতেজ রাখে। সাহরির আগে বা দিনের বেলায় ২০-৩০ মিনিটের একটি ছোট বিশ্রাম দেহ ও মস্তিষ্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে মনোযোগ কমে যায়, ক্লান্তি বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক চাপ বাড়ে। তাই ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তনের সাথে সাথে এর গুণগত মান বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত। ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক রাখতে ঘরের আলো, শব্দ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি
রমজান কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও মানসিক প্রশান্তি অর্জনের সময়। পরিবারের দায়িত্ব, কাজ ও ইবাদতের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা নারীর জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও এটি মানসিক শক্তি ও ধৈর্য বৃদ্ধি করে। ধ্যান, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত বা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে, মনকে সতেজ রাখে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ছোট বিরতি নেওয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁটা, হালকা সংগীত শোনা বা নিজেকে ছোট আনন্দ দেওয়া মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে।
বিশেষ সতর্কতা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা
রমজানের সময়ে নারীর শরীরে হরমোনাল পরিবর্তন, মাসিক চক্র বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই স্বাস্থ্য সচেতন থাকা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। হালকা খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের মাধ্যমে রোজার দিনগুলো স্বাস্থ্যকর ও আনন্দদায়ক করা সম্ভব।
সুস্থতা বজায় রাখার মূল নীতি
রমজান মাসে নারীর সুস্থতা বজায় রাখার জন্য কিছু মূল বিষয় মেনে চলা অপরিহার্য:
সঠিক খাদ্য ও পর্যাপ্ত পানি: শক্তি ধরে রাখে ও শরীরকে সতেজ রাখে।
হালকা ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম: শরীরকে সক্রিয় রাখে, ক্লান্তি কমায় এবং মনকে সতেজ রাখে।
মানসিক শান্তি ও আত্মিক প্রশান্তি: ইবাদত ও পরিবারে সুখ নিশ্চিত করে।
এই বিষয়গুলো মেনে চললে মাহে রমজান নারীর জন্য কেবল ইবাদতের মাস হিসেবে নয়, বরং সুস্থ দেহ, প্রাণবন্ত মন এবং পরিবারে সুখ নিশ্চিত করারও একটি বিশেষ সময় হয়ে ওঠে। রমজান আমাদের ধৈর্য, সততা ও ধ্যানশীলতা শেখার সুযোগ করে দেয়। সচেতন খাদ্যাভ্যাস, যথাযথ বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তি নারীর জীবনকে আনন্দময়, স্বাস্থ্যকর এবং পরিবারকে সুখময় করে তোলে। সুস্থ দেহে সুস্থ মন থাকলে নারীর ইবাদত, দৈনন্দিন কাজ এবং পরিবারের দায়িত্ব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়।
রিপোর্টারের নাম 





















