গোপালগঞ্জে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে শিক্ষার্থীদের প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষকরা। এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে কোটালীপাড়া সাংবাদিক ফোরাম। তাদের মতে, অনিয়মের প্রতিবাদকারী সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এই মানববন্ধন ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ শামিল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় কোটালীপাড়ার ৬৮ নং তারাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক সমিতির সভাপতি এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার কোটালীপাড়া প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। গত রবিবার বিকেলে তিনি অভিযোগ করেন যে, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নিষিদ্ধ গাইড বই কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের গাইড বই কিনতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এই অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
পরদিন সোমবার সকালে মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন যে, লেকচার প্রকাশনীর একজন প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের গাইড বই কিনতে প্ররোচিত করেছেন এবং পরবর্তীতে চাপও প্রয়োগ করেছেন। এই ঘটনা অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করে।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৬৮ নং তারাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার অধিকারী ও সহকারী শিক্ষক রসময় রত্নের নেতৃত্বে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে তারা অভিযোগ করেন যে, সাংবাদিক মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল শিক্ষকদের হয়রানি ও আতঙ্কিত করছেন। তবে, সাংবাদিক নেতারা দাবি করেন যে, শিক্ষকরা কীভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
অন্যদিকে, মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের এই মানববন্ধনের প্রতিবাদে মঙ্গলবার দুপুরে কোটালীপাড়া সাংবাদিক ফোরাম কার্যালয়ে একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সহ-সভাপতি কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কালাম তালুকদার সহ অন্যান্য সাংবাদিকরা বক্তব্য রাখেন। বক্তারা বলেন, সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে গাইড বই নিষিদ্ধ করলেও, ৬৮ নং তারাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গাইড বই কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্ররোচনা দিচ্ছেন—এমন অভিযোগ অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তারা প্রশ্ন তোলেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চাকরিরত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কীভাবে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ গাইড বই বিক্রির প্রচারণা চালাতে পারেন এবং এই বিষয়ে অভিযোগ ওঠায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবি না করে বরং অভিযোগকারী সাংবাদিকের বিরুদ্ধেই মানববন্ধন করেন? এটি একটি অনৈতিক বিষয় আড়াল করার চেষ্টা বলে তারা মন্তব্য করেন।
সাংবাদিক মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল জানান, তিনি বিদ্যালয়ের অভিভাবক-শিক্ষক এসোসিয়েশনের (পিটিএ) সভাপতি হিসেবে অভিভাবকদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষকতা একটি মহান পেশা এবং কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার তদন্ত হওয়া উচিত। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে মানববন্ধন করা হয়েছে, যার তীব্র নিন্দা জানান তিনি। তিনি বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলেও জানান।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার অধিকারীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাগুফতা হক জানিয়েছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গাইড বই ক্রয়ে শিক্ষার্থীদের প্ররোচনার একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের মানববন্ধনের বিষয়ে তিনি জানান, এ সংক্রান্ত কোনো লিখিত অভিযোগ তার দপ্তরে জমা পড়েনি।
রিপোর্টারের নাম 























