দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যানসি। সুমধুর কণ্ঠ দিয়ে ক্যারিয়ারের শুরুতেই জয় করেছিলেন কোটি শ্রোতার হৃদয়। তবে খ্যাতির শিখরে থাকার সময়েই তার জীবনে নেমে আসে একের পর এক প্রতিকূলতা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক দীর্ঘ পোস্টে ন্যানসি তুলে ধরেছেন তার জীবনের সেই চড়াই-উতরাই, মাতৃত্বের লড়াই এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা।
ন্যানসি জানান, মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেন তিনি। ১৯ বছর বয়সে প্রথম কন্যা রোদেলার জন্ম। ক্যারিয়ারের সেই স্বর্ণালী সময়ে মাতৃত্ব তার পেশাগত জীবনে কোনো বাধা হতে পারেনি। তবে সাড়ে চার বছর পর মাকে হারানোর শোক এবং পরবর্তী সময়ে অপরিকল্পিত দ্বিতীয় বিয়ে তার জীবনে ছন্দপতন ঘটায়। দ্বিতীয় সন্তান নায়লার জন্মের ঠিক আগে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশের জেরে তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়েন তিনি। শুরু হয় পুলিশের হয়রানি ও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। এক সময়ের ব্যস্ত এই শিল্পীর ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে, যা তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এক পর্যায়ে তার ওজন বেড়ে ৮৩ কেজিতে পৌঁছায়, যা তাকে চলাফেরায় পর্যন্ত কষ্টসাধ্য করে তুলেছিল।
সংগ্রামের বর্ণনা দিতে গিয়ে ন্যানসি লেখেন, ফ্যাসিবাদের আক্রোশে যখন তার ক্যারিয়ার নিভু নিভু, তখন ব্যক্তিগত জীবনেও নেমে আসে বিপর্যয়। তৃতীয় সন্তান আলিনাকে হারানোর শোক এবং সংসার ভাঙার যন্ত্রণা তাকে দমাতে পারেনি। নিজের ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন। ২০২০ সালে করোনার সময়ে নিজেকে সময় দেওয়া শুরু করেন এবং কঠোর পরিশ্রমে ওজন কমিয়ে ৬১ কেজিতে নিয়ে আসেন।
২০২১ সালে জীবনের নতুন মোড় আসে। পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং বর্তমানে স্বামী ও দুই কন্যাকে নিয়ে তার সুখের সংসার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফলে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ন্যান্সির জীবনেও সুবাতাস বইতে শুরু করে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটিয়ে তিনি আবারও যুক্ত হয়েছেন চলচ্চিত্র জুরিবোর্ড ও বিভিন্ন রিয়েলিটি শোর বিচারক হিসেবে। পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উচ্চশিক্ষা।
বর্তমানে নিজের শারীরিক সুস্থতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ন্যানসি জানান, যথাযথ চিকিৎসকের পরামর্শ ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের মাধ্যমে তিনি এখন ৫১ কেজি ওজনে ফিরে এসেছেন। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে তিনি কোনো অলৌকিক পন্থায় বিশ্বাসী নন, বরং সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক প্রশান্তিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
ভক্ত ও বিশেষ করে মায়েদের উদ্দেশ্যে ন্যানসি বলেন, “নিজের যত্ন নিন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন। ওজন কমানো কোনো ম্যাজিক নয়, এটি ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের বিষয়।” ঘরে সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলার জন্য তিনি সবাইকে আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে প্লেব্যাক দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা ন্যানসি ২০১১ সালে ‘প্রজাপতি’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া টানা সাতবার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই গুণী শিল্পী। সব বাধা পেরিয়ে ন্যান্সির এই ফিরে আসা অনেকের জন্যই এক অনুপ্রেরণার গল্প।
রিপোর্টারের নাম 























