ঢাকা ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বসন্তের রঙে রাঙা সুনামগঞ্জের শিমুল বাগান: পর্যটকদের পদচারণায় মুখর, উন্নয়নের অপেক্ষায়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৫২:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে সুনামগঞ্জের হাওর-পাহাড়-নদীর জনপদে প্রতি বছরই আসে এক ভিন্ন আমেজ। আকাশ-মাটি রাঙিয়ে তোলে শিমুল ফুলের রক্তিম আভা, আর সেই সৌন্দর্যের টানেই হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে তাহিরপুরের সুবিশাল শিমুল বাগান। লাল টুকটুকে শিমুলের রাজ্যে যেন ভালোবাসার উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে, যা উপভোগ করতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী।

শহরের কোলাহল ছেড়ে এক বুক প্রশান্তি আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এই বাগান এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামে অবস্থিত এই অনন্য শিমুল বাগানটির একপাশে বয়ে চলেছে সুরমা যাদুকাটা নদী, আর অন্যপাশে সুউচ্চ মেঘালয়ের পাহাড়। পাহাড়, নদী আর মাঝখানে আগুনরাঙা শিমুল ফুলের সমারোহ—এই অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশই বাগানটিকে দিয়েছে এক ভিন্নমাত্রিক সৌন্দর্য ও স্বতন্ত্র পরিচিতি।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শিমুল ফুলের এই নয়নাভিরাম রূপ প্রায় এক মাস স্থায়ী হয়। এই সময়ে ডালে ডালে পাখির কিচিরমিচির, শিশুদের হাসি আর দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে পুরো এলাকা এক প্রাণবন্ত উৎসবে পরিণত হয়। বাগানের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারি সারি লাল ফুলে ভরা শিমুল গাছ, আর ঝরে পড়া পাপড়ি যেন এক লাল কার্পেটের আস্তরণ বিছিয়ে রেখেছে।

জানা যায়, ২০০০ সালে বাদাঘাট ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে ৩ হাজারেরও বেশি শিমুল গাছ রোপণ করে এই বাগানটি গড়ে তোলেন। তার স্বপ্নের এই বাগান বর্তমানে ভাটির জনপদের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিমুল বাগান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে এর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন তার ছেলে রাখাব উদ্দিন।

বাগানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের মুগ্ধতার শেষ নেই। ঢাকা থেকে আসা নাদিয়া সুলতানা বলেন, “পাহাড়, নদী আর শিমুল ফুলের সমন্বয় সত্যিই অসাধারণ। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি একটি অনবদ্য স্থান।” আরেক পর্যটক কামরুল হাসান তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “এখানে এসে মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত চিত্রপটে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে লাল শিমুলের সমারোহ সত্যিই মন ভরে দেয়।”

তবে এই সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রের যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক দর্শনার্থী। সিলেট থেকে আসা মেহেদী হোসেন বলেন, “সড়কের অবস্থা খুবই নাজুক। দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙাচোরা পথে যাত্রা করতে হয়েছে। নতুন সরকার দ্রুত সড়ক উন্নয়ন করলে এখানে পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।” আরেক পর্যটক রুমানা আক্তার যোগ করেন, “এত সম্ভাবনাময় একটি পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। আমরা আশা করি, নতুন সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নসহ পর্যটকবান্ধব সুবিধা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।”

এই শিমুল বাগান স্থানীয়দের জন্য নতুন আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। দর্শনার্থীদের আগমনকে কেন্দ্র করে আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান ও খাবারের স্টল, যা অনেকের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা জানান, বসন্ত মৌসুমে বাগানকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে এই এলাকায় এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।

বাগানের তত্ত্বাবধায়ক রাখাব উদ্দিন বলেন, “এটি আমার বাবার হাতে গড়া স্বপ্নের বাগান। আমরা নিজেদের উদ্যোগে কিছু উন্নয়ন করেছি। তবে সরকারি সহায়তা পেলে আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা এই বাগানকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করবে।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বঙ্গোপসাগরে আমাদের কৌশলগত ভবিষ্যৎ

বসন্তের রঙে রাঙা সুনামগঞ্জের শিমুল বাগান: পর্যটকদের পদচারণায় মুখর, উন্নয়নের অপেক্ষায়

আপডেট সময় : ০২:৫২:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে সুনামগঞ্জের হাওর-পাহাড়-নদীর জনপদে প্রতি বছরই আসে এক ভিন্ন আমেজ। আকাশ-মাটি রাঙিয়ে তোলে শিমুল ফুলের রক্তিম আভা, আর সেই সৌন্দর্যের টানেই হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে তাহিরপুরের সুবিশাল শিমুল বাগান। লাল টুকটুকে শিমুলের রাজ্যে যেন ভালোবাসার উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে, যা উপভোগ করতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী।

শহরের কোলাহল ছেড়ে এক বুক প্রশান্তি আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এই বাগান এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামে অবস্থিত এই অনন্য শিমুল বাগানটির একপাশে বয়ে চলেছে সুরমা যাদুকাটা নদী, আর অন্যপাশে সুউচ্চ মেঘালয়ের পাহাড়। পাহাড়, নদী আর মাঝখানে আগুনরাঙা শিমুল ফুলের সমারোহ—এই অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশই বাগানটিকে দিয়েছে এক ভিন্নমাত্রিক সৌন্দর্য ও স্বতন্ত্র পরিচিতি।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শিমুল ফুলের এই নয়নাভিরাম রূপ প্রায় এক মাস স্থায়ী হয়। এই সময়ে ডালে ডালে পাখির কিচিরমিচির, শিশুদের হাসি আর দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে পুরো এলাকা এক প্রাণবন্ত উৎসবে পরিণত হয়। বাগানের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারি সারি লাল ফুলে ভরা শিমুল গাছ, আর ঝরে পড়া পাপড়ি যেন এক লাল কার্পেটের আস্তরণ বিছিয়ে রেখেছে।

জানা যায়, ২০০০ সালে বাদাঘাট ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে ৩ হাজারেরও বেশি শিমুল গাছ রোপণ করে এই বাগানটি গড়ে তোলেন। তার স্বপ্নের এই বাগান বর্তমানে ভাটির জনপদের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিমুল বাগান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে এর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন তার ছেলে রাখাব উদ্দিন।

বাগানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের মুগ্ধতার শেষ নেই। ঢাকা থেকে আসা নাদিয়া সুলতানা বলেন, “পাহাড়, নদী আর শিমুল ফুলের সমন্বয় সত্যিই অসাধারণ। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি একটি অনবদ্য স্থান।” আরেক পর্যটক কামরুল হাসান তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “এখানে এসে মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত চিত্রপটে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে লাল শিমুলের সমারোহ সত্যিই মন ভরে দেয়।”

তবে এই সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রের যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক দর্শনার্থী। সিলেট থেকে আসা মেহেদী হোসেন বলেন, “সড়কের অবস্থা খুবই নাজুক। দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙাচোরা পথে যাত্রা করতে হয়েছে। নতুন সরকার দ্রুত সড়ক উন্নয়ন করলে এখানে পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।” আরেক পর্যটক রুমানা আক্তার যোগ করেন, “এত সম্ভাবনাময় একটি পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। আমরা আশা করি, নতুন সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নসহ পর্যটকবান্ধব সুবিধা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।”

এই শিমুল বাগান স্থানীয়দের জন্য নতুন আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। দর্শনার্থীদের আগমনকে কেন্দ্র করে আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান ও খাবারের স্টল, যা অনেকের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা জানান, বসন্ত মৌসুমে বাগানকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে এই এলাকায় এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।

বাগানের তত্ত্বাবধায়ক রাখাব উদ্দিন বলেন, “এটি আমার বাবার হাতে গড়া স্বপ্নের বাগান। আমরা নিজেদের উদ্যোগে কিছু উন্নয়ন করেছি। তবে সরকারি সহায়তা পেলে আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা এই বাগানকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করবে।”