জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে ক্রিকেট অঙ্গনে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা এবং দুই ক্রিকেটারের ‘মানসিক কোমা’ বিষয়ক তার দাবি—সব মিলিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে একজন জাতীয় দলের দায়িত্বশীল কোচের ভূমিকা ও এখতিয়ার নিয়ে, একইসঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সামগ্রিক শৃঙ্খলাহীনতাও সামনে চলে এসেছে।
ভারত সফরে নিরাপত্তার কারণে দল না পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল একটি নীতিগত বিষয়। বাংলাদেশ ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের অনুরোধ করলেও আইসিসি তাতে সায় দেয়নি, ফলে বাংলাদেশ ছাড়াই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে অংশগ্রহণ শুধু খেলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কূটনীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য ও সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থ এবং মর্যাদা। এসব বিবেচনায় সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল সার্বভৌম ও সংবেদনশীল। এমন একটি সংবেদনশীল সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা তীব্র ভাষায় সমালোচনা করা একজন জাতীয় দলের সহকারী কোচের পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণত, সহকারী কোচের মূল কাজ হলো ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স, মানসিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত উন্নয়নে সহায়তা করা। সরকারের নীতি বা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা তার পেশাগত দায়িত্বের অংশ নয়, বরং দলের ভেতরে স্থিতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাই তার প্রধান কর্তব্য। তার এই মন্তব্যে দলীয় কাঠামোর নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই সমালোচনা এতদিন পর কেন? যে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা এখন আর ক্ষমতায় নেই। যদি সরকারের সিদ্ধান্তে তার আপত্তি থেকেই থাকে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কেন অবস্থান স্পষ্ট করেননি? যখন সেই সরকার আর দায়িত্বে নেই, তখন হঠাৎ করে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করাকে অনেকে সময়োপযোগী নয়, বরং জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিল, খেলোয়াড়রাও তা অনুসরণ করেছেন। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখানো প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। বিশ্বকাপে অংশ নিলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সরকার মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল, যা একটি নীতিগত অবস্থান। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল প্রেক্ষাপটে কখনো কখনো অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে জাতীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তা বড় হয়ে ওঠে। একজন কোচ হিসেবে তার উচিত ছিল ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, সরকারি সিদ্ধান্তকে কাঠগড়ায় তোলা নয়।
বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সালাউদ্দিনের ‘মানসিক কোমা’র দাবি নিয়ে। তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপে খেলতে না পারায় দুজন ক্রিকেটার নাকি পাঁচদিন ধরে মানসিক কোমায় ছিলেন। প্রশ্ন হলো, যদি সত্যিই সেই দুজন অজ্ঞাতনামা ক্রিকেটার মানসিকভাবে কোমায় থাকেন, তাহলে অভিভাবক সংস্থা হিসেবে বিসিবি কি তাদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়েছিল? এই বিষয়ে বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদিন ফাহিম জানিয়েছেন, ‘কোথায় শুনেছেন এসব কথা? আমার কাছে এমন কোনো তথ্য নেই।’ তাহলে সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন কেন এতদিন এই বিষয়টি চেপে রাখলেন? এই দাবির সত্যতার ভিত্তি কী? নাকি এটি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছুটা বাহবা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে করা একটি জনপ্রিয়তাবাদী মন্তব্য?
লাগামছাড়া মন্তব্যের কারণে বিসিবির বেশ কয়েকজন পরিচালক ইতোমধ্যেই হাস্যকর পাত্রে পরিণত হয়েছেন। এবার সেই তালিকায় নিজেকে যুক্ত করলেন দলের সহকারী কোচও। “যেমন খুশি তেমন সাজো”-র মতো বিসিবিতে এখন যার যেমন খুশি তেমন মন্তব্য করার খামখেয়ালিপূর্ণ আচরণ পুরো বোর্ডকে একটি বিশৃঙ্খল সংস্থায় পরিণত করেছে। বোর্ডের পরিচালক, কোচ এবং ক্রিকেটাররা সবাই কোনো বিধিবিধান না মেনে যখন যা মনে আসছে, সেটা বলে মনের সুখ মেটাচ্ছেন। এই ধরনের লাগামহীন মন্তব্যগুলো শুধু দলের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এখন অপেক্ষা শুধু এইটুকু শোনার যে, বিশ্বকাপ খেলতে না পারার দুঃখে কেউ কেউ আত্মহত্যার চিন্তাও করেছিলেন!
রিপোর্টারের নাম 

























