বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদ থেকে বিতর্কিতভাবে বিদায় নিলেন ড. আহসান এইচ মনসুর। অর্থনীতির ‘শুদ্ধি অভিযান’ ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যাংক খাতকে সংকটে ফেলা এবং ব্যক্তিগত আখের গুছানোর অভিযোগ নিয়ে তাঁকে বিদায় নিতে হলো। বুধবার তাঁর পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
দুবাইয়ে ফ্ল্যাট ও দুর্নীতির অভিযোগ আহসান এইচ মনসুরের বিদায়বেলায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে দুবাইয়ে তাঁর মেয়ের নামে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার (১৩.৫ মিলিয়ন দিরহাম) একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনাসংক্রান্ত তথ্য। দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর আল জাদ্দাফ এলাকায় এই ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সজীব ওয়াজেদ জয়ের শেয়ার করা একটি পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আসে, যেখানে গভর্নরের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও আহসান মনসুর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে দলিলের তথ্য তাঁর দাবির বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে।
বিদেশ সফরের রেকর্ড ও প্রশাসনিক অনিয়ম দায়িত্ব পাওয়ার প্রথম ১৪ মাসে আহসান এইচ মনসুর মোট ১৪ বার বিদেশ সফর করেছেন, যার সমষ্টি ছিল ১০০ দিন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত দীর্ঘ বিদেশ সফরের নজির নেই। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বিএফআইইউ-এর (BFIU) অত্যন্ত গোপনীয় ও স্পর্শকাতর তথ্য নিজের একান্ত সচিবের মাধ্যমে পাচার করার। অভিযোগ অনুযায়ী, ফ্রিজ করা ব্যাংক হিসাব সচল করার নামে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বড় অংকের টাকা আদায়ের বাণিজ্য চলেছে তাঁরই ছত্রচ্ছায়ায়।
অর্থনীতির টালমাটাল দশা গভর্নর হিসেবে তাঁর গৃহীত মুদ্রানীতি দেশের শিল্প খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দোহাই দিয়ে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোয় ব্যাংক ঋণের সুদ ১৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অথচ এত কড়াকড়ির পরও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তোলা মূল্যস্ফীতি কমেনি।
ব্যর্থ সংস্কার ও বিলাসিতা ইসলামী ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন ও তদন্তের নামে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে চাপে রাখায় বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি উপেক্ষা করে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে বাদ দিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি (MPV) কেনার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গত সপ্তাহেই তাঁরা এসব অনিয়ম বন্ধের জন্য গভর্নরকে লিখিত চিঠি দিয়েছিলেন। অবশেষে সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে বুধবার তিনি বিদায় নিলেন, যা দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রিপোর্টারের নাম 




















