ঢাকা ০৩:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভাষাকন্যাদের সাহসী ভাবনায় অবিনাশী একুশ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:০৭:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

## শিরোনাম: ভাষাকন্যাদের অকুতোভয় আত্মত্যাগ: একুশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

লিড প্যারাগ্রাফ: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কেবল পুরুষদের রাজপথের সংগ্রাম ছিল না, বরং এর প্রতিটি পরতে মিশে ছিল নারীদের অদম্য সাহস, আত্মত্যাগ এবং অগ্রণী ভূমিকা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিছিলে অংশগ্রহণ, আহতদের সেবা, পোস্টার তৈরি এবং গ্রেপ্তার বরণ—প্রতিটি কাজেই তারা ছিলেন অগ্রগামী। এই সাহসী নারীদের ভাবনা ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ভাষা আন্দোলন হয়ে উঠেছিল এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

বিস্তারিত বর্ণনা:

একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার দিন নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের এক মহিমান্বিত জয়গান। বায়ান্নর সেই উত্তাল ফাল্গুনে, যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত, তখন অন্তঃপুরের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন একদল নির্ভীক নারী। ইতিহাসের পাতায় আজও উজ্জ্বল হয়ে আছেন রওশন আরা বাচ্চু, যিনি পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই মিছিলে শামিল হয়েছিলেন সুফিয়া কামাল, লিলি চক্রবর্তী, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, জহরত আরা আর মমতাজ বেগমদের মতো লড়াকু প্রাণ। তারা জেল-জুলুম সয়েও বাংলার মানচিত্রকে ভাষার দাবিতে রাঙিয়েছিলেন।

একজন নারীর চোখে একুশ কেবল সন্তান হারানোর বেদনা নয়, বরং সেই রক্তস্রোতে ধুয়ে আসা পবিত্র বর্ণমালাকে পরম মমতায় আগলে রাখার জয়ধ্বনি। নারী কেবল মিছিলে হেঁটে থেমে থাকেননি, বরং ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ভাষার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। আজকের দিনেও এই অবিনাশী চেতনা আমাদের প্রতিটি নারীর রক্তে প্রবহমান, যা শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করতে। একুশ অমর কারণ এটি ত্যাগের এক শাশ্বত দলিল।

ইডেন মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাম্মী শফিক জুঁই-এর ভাষায়, “একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই আত্মপরিচয় যখন মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছিল, তখন নারীরাও সাহসের সঙ্গে নিজেদের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন। ঘরের চার দেয়াল ভেঙে তারা নেমে এসেছিলেন রাজপথে এবং জয় করে নিয়েছেন নিজেদের আত্মপরিচয়, যেখানে লুক্কায়িত ছিল নারীর সাহস, দৃঢ়তা এবং অবিচল অবস্থান।”

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে জোবায়দা মনে করেন, “ভাষার সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক পরতে নারীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা মিছিলে, প্রতিবাদে, আহতদের সেবায়, লিফলেট লেখা ও বিতরণে এবং আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ে দেখিয়েছেন দৃঢ়তা আর আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আন্দোলনের ভিত গড়ে দিতে তাদের অবদান ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী।”

ইডেন মহিলা কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসের চেতনাদীপ্ত একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি অধ্যায় নয়, এটি নারীর প্রতিবাদী কণ্ঠ, দৃঢ় পদচারণা ও মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য দলিল। ভাষার অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনে নারীরা নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি, বরং মিছিলের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে ভয়কে জয় করেছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “আন্দোলনকারীদের দমানোর জন্য পুলিশ গুলি চালালে অনেকে শহীদ ও আহত হন। আহতদের চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীসহ আরো অনেকে, যা নারীদের মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রুমিয়া হক শর্মী-এর মতে, “একুশ মানে একটি চেতনা, যা বারবার জন্ম নেয় নারীর মননে, সংগ্রামে ও প্রতিবাদে। প্রতিবার যখন নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সমতার দাবি তোলে, নিজের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন থাকে, তখনই নতুন করে জেগে ওঠে একুশের চেতনা। ভাষা যেমন মানুষের পরিচয়ের বাহক, তেমনি নারীর কণ্ঠস্বরও তার অস্তিত্বের প্রকাশ।”

ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী আফরিদা ইসলাম মনে করিয়ে দেন, “ভাষা আন্দোলন কেবল শিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমগ্র বাঙালি জাতিকে একত্র করেছিল। পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে নারীরাও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেয়। তারা পোস্টার ও স্লোগান লিখন থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি টাকা তুলে আহতদের লুকিয়ে চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন, এমনকি অনেকজনকে জেলেও যেতে হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেমের স্ত্রী রাহেলা আন্দোলনের নেতাদের নিরাপদ রাখতেন এবং রান্না করে খাওয়াতেন। গ্রামের নারীরা, যারা তখন পর্দা প্রথার আড়ালে বন্দি ছিলেন, তারা সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা অগ্রাহ্য করে বাংলা ভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন। নারীদের এই সাহসিকতাই অধিকার ও ভাষার আন্দোলনকে করে তুলেছিল আরো বেগবান ও শক্তিশালী।”

এই ভাষাকন্যারা কেবল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনেই নয়, বরং আজও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা যোগান। তাদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ একুশের চেতনাকে চিরন্তন করে রেখেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদুল ফিতরে টানা ছুটির হাতছানি: জেনে নিন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবকাশের সময়সূচি

ভাষাকন্যাদের সাহসী ভাবনায় অবিনাশী একুশ

আপডেট সময় : ০১:০৭:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## শিরোনাম: ভাষাকন্যাদের অকুতোভয় আত্মত্যাগ: একুশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

লিড প্যারাগ্রাফ: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কেবল পুরুষদের রাজপথের সংগ্রাম ছিল না, বরং এর প্রতিটি পরতে মিশে ছিল নারীদের অদম্য সাহস, আত্মত্যাগ এবং অগ্রণী ভূমিকা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিছিলে অংশগ্রহণ, আহতদের সেবা, পোস্টার তৈরি এবং গ্রেপ্তার বরণ—প্রতিটি কাজেই তারা ছিলেন অগ্রগামী। এই সাহসী নারীদের ভাবনা ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ভাষা আন্দোলন হয়ে উঠেছিল এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

বিস্তারিত বর্ণনা:

একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার দিন নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের এক মহিমান্বিত জয়গান। বায়ান্নর সেই উত্তাল ফাল্গুনে, যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত, তখন অন্তঃপুরের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন একদল নির্ভীক নারী। ইতিহাসের পাতায় আজও উজ্জ্বল হয়ে আছেন রওশন আরা বাচ্চু, যিনি পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই মিছিলে শামিল হয়েছিলেন সুফিয়া কামাল, লিলি চক্রবর্তী, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, জহরত আরা আর মমতাজ বেগমদের মতো লড়াকু প্রাণ। তারা জেল-জুলুম সয়েও বাংলার মানচিত্রকে ভাষার দাবিতে রাঙিয়েছিলেন।

একজন নারীর চোখে একুশ কেবল সন্তান হারানোর বেদনা নয়, বরং সেই রক্তস্রোতে ধুয়ে আসা পবিত্র বর্ণমালাকে পরম মমতায় আগলে রাখার জয়ধ্বনি। নারী কেবল মিছিলে হেঁটে থেমে থাকেননি, বরং ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ভাষার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। আজকের দিনেও এই অবিনাশী চেতনা আমাদের প্রতিটি নারীর রক্তে প্রবহমান, যা শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করতে। একুশ অমর কারণ এটি ত্যাগের এক শাশ্বত দলিল।

ইডেন মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাম্মী শফিক জুঁই-এর ভাষায়, “একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই আত্মপরিচয় যখন মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছিল, তখন নারীরাও সাহসের সঙ্গে নিজেদের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন। ঘরের চার দেয়াল ভেঙে তারা নেমে এসেছিলেন রাজপথে এবং জয় করে নিয়েছেন নিজেদের আত্মপরিচয়, যেখানে লুক্কায়িত ছিল নারীর সাহস, দৃঢ়তা এবং অবিচল অবস্থান।”

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে জোবায়দা মনে করেন, “ভাষার সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক পরতে নারীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা মিছিলে, প্রতিবাদে, আহতদের সেবায়, লিফলেট লেখা ও বিতরণে এবং আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ে দেখিয়েছেন দৃঢ়তা আর আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আন্দোলনের ভিত গড়ে দিতে তাদের অবদান ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী।”

ইডেন মহিলা কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসের চেতনাদীপ্ত একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি অধ্যায় নয়, এটি নারীর প্রতিবাদী কণ্ঠ, দৃঢ় পদচারণা ও মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য দলিল। ভাষার অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনে নারীরা নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি, বরং মিছিলের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে ভয়কে জয় করেছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “আন্দোলনকারীদের দমানোর জন্য পুলিশ গুলি চালালে অনেকে শহীদ ও আহত হন। আহতদের চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীসহ আরো অনেকে, যা নারীদের মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রুমিয়া হক শর্মী-এর মতে, “একুশ মানে একটি চেতনা, যা বারবার জন্ম নেয় নারীর মননে, সংগ্রামে ও প্রতিবাদে। প্রতিবার যখন নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সমতার দাবি তোলে, নিজের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন থাকে, তখনই নতুন করে জেগে ওঠে একুশের চেতনা। ভাষা যেমন মানুষের পরিচয়ের বাহক, তেমনি নারীর কণ্ঠস্বরও তার অস্তিত্বের প্রকাশ।”

ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী আফরিদা ইসলাম মনে করিয়ে দেন, “ভাষা আন্দোলন কেবল শিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমগ্র বাঙালি জাতিকে একত্র করেছিল। পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে নারীরাও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেয়। তারা পোস্টার ও স্লোগান লিখন থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি টাকা তুলে আহতদের লুকিয়ে চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন, এমনকি অনেকজনকে জেলেও যেতে হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেমের স্ত্রী রাহেলা আন্দোলনের নেতাদের নিরাপদ রাখতেন এবং রান্না করে খাওয়াতেন। গ্রামের নারীরা, যারা তখন পর্দা প্রথার আড়ালে বন্দি ছিলেন, তারা সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা অগ্রাহ্য করে বাংলা ভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন। নারীদের এই সাহসিকতাই অধিকার ও ভাষার আন্দোলনকে করে তুলেছিল আরো বেগবান ও শক্তিশালী।”

এই ভাষাকন্যারা কেবল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনেই নয়, বরং আজও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা যোগান। তাদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ একুশের চেতনাকে চিরন্তন করে রেখেছে।