ঢাকা ০২:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে রমজানেও নাজেহাল ভোক্তারা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:০৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে দেশে রেকর্ড পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি হয়েছে। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আড়ত ও গুদামগুলো এখন মালামালে ঠাসা। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় বাজারে বেচাকেনাও জমে উঠেছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, সরবরাহ বাড়লেও রহস্যজনকভাবে বাড়ছে প্রতিটি পণ্যের দাম। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা—সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন: পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও কেন বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না?

বুধবার সকালে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি আড়ত ও গুদামে পণ্যের উপচে পড়া ভিড়। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের দীর্ঘ সারি জেলগেট পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। শ্রমিকদের ব্যস্ততা এবং আড়তদারদের বেচাকেনায় বাজার জমজমাট থাকলেও স্বস্তিতে নেই সাধারণ ভোক্তারা। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনের পরবর্তী মাত্র ছয় দিনে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমদানিকারকরা মাঝখানে চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা কিংবা নির্বাচনের ছুটিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করালেও বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

পণ্যের দামের চিত্র: খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে ছোলার দাম গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নির্বাচনের আগে যে সাধারণ মানের ছোলা ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ৭৫ টাকায় ঠেকেছে। ভালো মানের ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮২ টাকায়। একইভাবে ৭৪ টাকার মটর ডাল ৭৮ টাকা এবং ৭৫ টাকার মসুর ডাল ৮১-৮২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুকনা মরিচ থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের ডালের দামই এখন ঊর্ধ্বমুখী। রমজানের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরের বাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। সরকার খেজুর আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক কমানোর ফলে ৪৭ হাজার টনের বেশি খেজুর আমদানি হলেও বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব নেই। উল্টো কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

আমদানি পরিসংখ্যান ও প্রশাসনের ভূমিকা: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রমজানের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য ইতোমধ্যে বন্দর থেকে খালাস হয়েছে। যেখানে ১ লাখ টন ছোলার চাহিদা রয়েছে, সেখানে খালাস হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টন। ভোজ্য তেল ও চিনির মজুতও চাহিদার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিনের মতে, পরিসংখ্যানে সংকটের কোনো চিহ্ন নেই। তবুও কেন দাম বাড়ছে, তা এক বড় রহস্য। খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি সোলাইমান বাদশা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন আমদানিকারকদের দিকে। তিনি জানান, আমদানিকারকরাই কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বেশি দামে পণ্য বিক্রির নির্দেশনা দিচ্ছেন।

ভোক্তাদের উদ্বেগ ও প্রতিকার: কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাজারকে জিম্মি করে ফেলেছে। নির্বাচনের ডামাডোলে প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে পুঁজি করে আমদানিকারকরা এই সুযোগ নিচ্ছেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলেও তা খুচরা পর্যায়ে সীমিত থাকছে। বড় আমদানিকারকদের উৎস মুখে অভিযান না চালালে এই অস্থিরতা কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে রমজানেও নাজেহাল ভোক্তারা

আপডেট সময় : ০২:০৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে দেশে রেকর্ড পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি হয়েছে। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আড়ত ও গুদামগুলো এখন মালামালে ঠাসা। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় বাজারে বেচাকেনাও জমে উঠেছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, সরবরাহ বাড়লেও রহস্যজনকভাবে বাড়ছে প্রতিটি পণ্যের দাম। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা—সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন: পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও কেন বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না?

বুধবার সকালে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি আড়ত ও গুদামে পণ্যের উপচে পড়া ভিড়। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের দীর্ঘ সারি জেলগেট পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। শ্রমিকদের ব্যস্ততা এবং আড়তদারদের বেচাকেনায় বাজার জমজমাট থাকলেও স্বস্তিতে নেই সাধারণ ভোক্তারা। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনের পরবর্তী মাত্র ছয় দিনে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমদানিকারকরা মাঝখানে চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা কিংবা নির্বাচনের ছুটিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করালেও বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

পণ্যের দামের চিত্র: খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে ছোলার দাম গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নির্বাচনের আগে যে সাধারণ মানের ছোলা ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ৭৫ টাকায় ঠেকেছে। ভালো মানের ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮২ টাকায়। একইভাবে ৭৪ টাকার মটর ডাল ৭৮ টাকা এবং ৭৫ টাকার মসুর ডাল ৮১-৮২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুকনা মরিচ থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের ডালের দামই এখন ঊর্ধ্বমুখী। রমজানের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরের বাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। সরকার খেজুর আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক কমানোর ফলে ৪৭ হাজার টনের বেশি খেজুর আমদানি হলেও বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব নেই। উল্টো কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

আমদানি পরিসংখ্যান ও প্রশাসনের ভূমিকা: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রমজানের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য ইতোমধ্যে বন্দর থেকে খালাস হয়েছে। যেখানে ১ লাখ টন ছোলার চাহিদা রয়েছে, সেখানে খালাস হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টন। ভোজ্য তেল ও চিনির মজুতও চাহিদার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিনের মতে, পরিসংখ্যানে সংকটের কোনো চিহ্ন নেই। তবুও কেন দাম বাড়ছে, তা এক বড় রহস্য। খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি সোলাইমান বাদশা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন আমদানিকারকদের দিকে। তিনি জানান, আমদানিকারকরাই কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বেশি দামে পণ্য বিক্রির নির্দেশনা দিচ্ছেন।

ভোক্তাদের উদ্বেগ ও প্রতিকার: কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাজারকে জিম্মি করে ফেলেছে। নির্বাচনের ডামাডোলে প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে পুঁজি করে আমদানিকারকরা এই সুযোগ নিচ্ছেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলেও তা খুচরা পর্যায়ে সীমিত থাকছে। বড় আমদানিকারকদের উৎস মুখে অভিযান না চালালে এই অস্থিরতা কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।