ঢাকা ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্বাধীনতার পরেও মানসিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ জাতি?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৫৬:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

রাজনৈতিকভাবে সার্বভৌমত্ব অর্জনের দীর্ঘ সময় পেরিয়েও কেন একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকরা মানসিকভাবে অন্য রাষ্ট্রের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, এই প্রশ্নটি আজ বড় এক বাস্তবতায় আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় মুখেই স্বাধীনতার জয়গান গাওয়া হলেও, বাস্তবে অনেকেই নিজেদের মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে পারেন না। এটি কেবল আবেগিক বিষয় নয়, বরং মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির এক গভীর উপলব্ধির ক্ষেত্র।

একাডেমিক পরিভাষায় এই অবস্থাকে ‘মানসিক উপনিবেশবাদ’ (Colonial Mentality), ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (Cultural Hegemony), ‘অন্তর্নিহিত হীনম্মন্যতা’ (Internalized Inferiority) অথবা ‘নরম শক্তির প্রভাব’ (Soft Power Dominance) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধারণাগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, কীভাবে মানুষ অবচেতন মনে নিজের সমাজ ও দেশকে কম সক্ষম মনে করে এবং অন্য সমাজ বা রাষ্ট্রকে স্বাভাবিকভাবেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়ে দেয়। রাজনৈতিক মুক্তি লাভ করেও আমরা ধীরে ধীরে অন্যের তৈরি ধারণা, মানদণ্ড এবং প্রভাবের অধীনে এক নীরব দাসত্বে আবদ্ধ হয়ে পড়ি।

যখন আমরা দেশের স্বাধীনতার কথা বলি, তখন প্রায়শই তা কেবল ভূখণ্ড, সীমানা বা সংবিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, স্বাধীনতার সবচেয়ে গভীর এবং অর্থপূর্ণ স্তরটি নিহিত রয়েছে প্রতিটি নাগরিকের মানসিক মুক্তির মধ্যে। এই মানসিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন থেকেই এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে – আমরা কি সত্যিই মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পেরেছি? নাকি স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও আমরা অন্য রাষ্ট্র, সংস্কৃতি এবং তাদের বর্ণিত বাস্তবতার প্রতি মানসিকভাবে অনুগত রয়ে গেছি? এই প্রশ্নটি কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের বহু প্রাক্তন উপনিবেশিক দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য।

এই মানসিক দাসত্ব বা পরাধীনতার পেছনে রয়েছে বহু দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কারণ। এই কারণগুলোর সম্মিলিত প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে এবং অবচেতন মনে পরবর্তী প্রজন্মকেও একই মানসিক কাঠামোর মধ্যে গড়ে তোলে। প্রথমত, এই পরাধীন মানসিকতার পেছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট একCrucial ভূমিকা পালন করে। আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক দিকগুলো সম্পর্কে অবগত থাকি এবং সেগুলোর প্রভাব নিয়ে আলোচনাও করি। বর্তমান সময়েও যে সেই শাসনের রেশ রয়ে গেছে, তা অনেকেই স্বীকার করেন। তবে, ঔপনিবেশিক শাসন যে কেবল রাষ্ট্রব্যবস্থাই নয়, বরং মানুষের চিন্তা-ভাবনা, আত্মমূল্যবোধ এবং ‘উন্নত-অনুন্নত’ ধারণাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং সেই মানসিক বোঝা আমরা আজও বহন করছি – এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের সচেতনতা যেমন কম, তেমনি আলোচনা করার ক্ষেত্রেও এক ধরনের অনীহা দেখা যায়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান রাজধানীতে পাকিস্তানের বিমান হামলার অভিযোগ, সীমান্তে চরম উত্তেজনা

স্বাধীনতার পরেও মানসিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ জাতি?

আপডেট সময় : ১০:৫৬:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনৈতিকভাবে সার্বভৌমত্ব অর্জনের দীর্ঘ সময় পেরিয়েও কেন একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকরা মানসিকভাবে অন্য রাষ্ট্রের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, এই প্রশ্নটি আজ বড় এক বাস্তবতায় আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় মুখেই স্বাধীনতার জয়গান গাওয়া হলেও, বাস্তবে অনেকেই নিজেদের মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে পারেন না। এটি কেবল আবেগিক বিষয় নয়, বরং মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির এক গভীর উপলব্ধির ক্ষেত্র।

একাডেমিক পরিভাষায় এই অবস্থাকে ‘মানসিক উপনিবেশবাদ’ (Colonial Mentality), ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (Cultural Hegemony), ‘অন্তর্নিহিত হীনম্মন্যতা’ (Internalized Inferiority) অথবা ‘নরম শক্তির প্রভাব’ (Soft Power Dominance) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধারণাগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, কীভাবে মানুষ অবচেতন মনে নিজের সমাজ ও দেশকে কম সক্ষম মনে করে এবং অন্য সমাজ বা রাষ্ট্রকে স্বাভাবিকভাবেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়ে দেয়। রাজনৈতিক মুক্তি লাভ করেও আমরা ধীরে ধীরে অন্যের তৈরি ধারণা, মানদণ্ড এবং প্রভাবের অধীনে এক নীরব দাসত্বে আবদ্ধ হয়ে পড়ি।

যখন আমরা দেশের স্বাধীনতার কথা বলি, তখন প্রায়শই তা কেবল ভূখণ্ড, সীমানা বা সংবিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, স্বাধীনতার সবচেয়ে গভীর এবং অর্থপূর্ণ স্তরটি নিহিত রয়েছে প্রতিটি নাগরিকের মানসিক মুক্তির মধ্যে। এই মানসিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন থেকেই এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে – আমরা কি সত্যিই মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পেরেছি? নাকি স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও আমরা অন্য রাষ্ট্র, সংস্কৃতি এবং তাদের বর্ণিত বাস্তবতার প্রতি মানসিকভাবে অনুগত রয়ে গেছি? এই প্রশ্নটি কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের বহু প্রাক্তন উপনিবেশিক দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য।

এই মানসিক দাসত্ব বা পরাধীনতার পেছনে রয়েছে বহু দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কারণ। এই কারণগুলোর সম্মিলিত প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে এবং অবচেতন মনে পরবর্তী প্রজন্মকেও একই মানসিক কাঠামোর মধ্যে গড়ে তোলে। প্রথমত, এই পরাধীন মানসিকতার পেছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট একCrucial ভূমিকা পালন করে। আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক দিকগুলো সম্পর্কে অবগত থাকি এবং সেগুলোর প্রভাব নিয়ে আলোচনাও করি। বর্তমান সময়েও যে সেই শাসনের রেশ রয়ে গেছে, তা অনেকেই স্বীকার করেন। তবে, ঔপনিবেশিক শাসন যে কেবল রাষ্ট্রব্যবস্থাই নয়, বরং মানুষের চিন্তা-ভাবনা, আত্মমূল্যবোধ এবং ‘উন্নত-অনুন্নত’ ধারণাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং সেই মানসিক বোঝা আমরা আজও বহন করছি – এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের সচেতনতা যেমন কম, তেমনি আলোচনা করার ক্ষেত্রেও এক ধরনের অনীহা দেখা যায়।