ঢাকা ০৭:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাষ্ট্র সংস্কার ও স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ: অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলার মূল্যায়ন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১০:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, শাসনতান্ত্রিক নিপীড়ন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। মূলত ১৯৩৭ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট কিংবা ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট—বাঙালির রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রতিটি ধাপে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। যখনই এই আকাঙ্ক্ষাকে অবদমন করা হয়েছে, তখনই এ দেশের মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতারই এক আধুনিক সংস্করণ।

একটি ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রীয় কাঠামো, ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং চরম আস্থাহীনতার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক রূপান্তর কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এই সরকার কোনো প্রথাগত নির্বাচনের মাধ্যমে আসেনি, বরং গণআকাঙ্ক্ষার ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুভার কাঁধে তুলে নিয়েছে। তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখা এবং জনমনে নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের বোধ ফিরিয়ে আনা।

বিগত সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতসহ সাধারণ মানুষের ওপর যে নজিরবিহীন দমন-পীড়নের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের নগ্ন দলীয়করণ রাষ্ট্রকে একটি অকার্যকর সত্তায় পরিণত করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ ছিল রাষ্ট্রকে ‘ফ্যাসিবাদী’ কাঠামো থেকে মুক্ত করে একটি গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই সরকারকে নানামুখী চাপের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে দীর্ঘদিনের বঞ্চিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর পর্বতপ্রমাণ প্রত্যাশা, অন্যদিকে পতিত স্বৈরাচারী শক্তির দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা—সব মিলিয়ে সরকার একটি ‘ওভারলোডেড’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে উসকানি এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা প্রশাসনের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণরোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর বা অস্থিরতা দেখা দিলেও, রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা এই সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য।

রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার যে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করেছে, তা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতো বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, একটি বিভক্ত সমাজে স্থিতিশীলতা আনতে হলে জাতীয় ঐকমত্য ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। এই সরকার রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেই পথই প্রশস্ত করার চেষ্টা করছে।

পরিশেষে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা কেবল দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে নয়, বরং টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরির ওপর নির্ভর করছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার যে চ্যালেঞ্জ তারা নিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক যুগে প্রবেশ করবে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সংস্কারের এই রূপরেখাই হবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রক্ষাকবচ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান রাজধানীতে পাকিস্তানের বিমান হামলার অভিযোগ, সীমান্তে চরম উত্তেজনা

রাষ্ট্র সংস্কার ও স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ: অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলার মূল্যায়ন

আপডেট সময় : ১০:১০:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, শাসনতান্ত্রিক নিপীড়ন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। মূলত ১৯৩৭ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট কিংবা ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট—বাঙালির রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রতিটি ধাপে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। যখনই এই আকাঙ্ক্ষাকে অবদমন করা হয়েছে, তখনই এ দেশের মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতারই এক আধুনিক সংস্করণ।

একটি ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রীয় কাঠামো, ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং চরম আস্থাহীনতার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক রূপান্তর কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এই সরকার কোনো প্রথাগত নির্বাচনের মাধ্যমে আসেনি, বরং গণআকাঙ্ক্ষার ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুভার কাঁধে তুলে নিয়েছে। তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখা এবং জনমনে নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের বোধ ফিরিয়ে আনা।

বিগত সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতসহ সাধারণ মানুষের ওপর যে নজিরবিহীন দমন-পীড়নের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের নগ্ন দলীয়করণ রাষ্ট্রকে একটি অকার্যকর সত্তায় পরিণত করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ ছিল রাষ্ট্রকে ‘ফ্যাসিবাদী’ কাঠামো থেকে মুক্ত করে একটি গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই সরকারকে নানামুখী চাপের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে দীর্ঘদিনের বঞ্চিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর পর্বতপ্রমাণ প্রত্যাশা, অন্যদিকে পতিত স্বৈরাচারী শক্তির দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা—সব মিলিয়ে সরকার একটি ‘ওভারলোডেড’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে উসকানি এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা প্রশাসনের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণরোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর বা অস্থিরতা দেখা দিলেও, রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা এই সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য।

রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার যে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করেছে, তা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতো বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, একটি বিভক্ত সমাজে স্থিতিশীলতা আনতে হলে জাতীয় ঐকমত্য ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। এই সরকার রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেই পথই প্রশস্ত করার চেষ্টা করছে।

পরিশেষে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা কেবল দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে নয়, বরং টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরির ওপর নির্ভর করছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার যে চ্যালেঞ্জ তারা নিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক যুগে প্রবেশ করবে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সংস্কারের এই রূপরেখাই হবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রক্ষাকবচ।