বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে। ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য—সর্বত্রই যুদ্ধের দামামা। গাজার মানবিক বিপর্যয়, ইরানের পারমাণবিক উদ্বেগ, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট এবং আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে শক্তিধর দেশগুলোর নতুন প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় যখন শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই এক আলোচিত উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ বা ‘শান্তি পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি নিজেই দায়িত্ব পালন করবেন। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, এই বোর্ড জাতিসংঘের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, যার প্রাথমিক লক্ষ্য হবে গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। গাজা পুনর্গঠনে এই বোর্ডের পরিকল্পনায় রয়েছে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির মাধ্যমে একটি টেকসই প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা।
ইতিমধ্যেই সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের অন্তত ৩৫টি দেশ এই উদ্যোগে শামিল হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা নিয়ে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এই প্রস্তাব থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক রাজনীতির অন্য দুই প্রধান শক্তি চীন ও রাশিয়া এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। বিশেষ করে, বোর্ডের স্থায়ী সদস্য হওয়ার জন্য প্রতিটি দেশকে ১০০ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার শর্ত এবং এর কর্মপদ্ধতি নিয়ে অস্পষ্টতা অনেক দেশের মধ্যেই এক ধরনের সতর্কতা ও সংশয় তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গঠিত জাতিসংঘ বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের ‘ভেটো’ রাজনীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গাজা বা ইউক্রেন সংকটে সংস্থাটির সীমাবদ্ধতা ট্রাম্পের এই ‘বোর্ড অব পিস’-কে একটি বিকল্প বহুপাক্ষিক কাঠামো হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। ট্রাম্প বরাবরই প্রথাগত আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন—জাতিসংঘ বা ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান। তার এই নতুন উদ্যোগ মূলত আন্তর্জাতিক আইন বা নৈতিকতার চেয়ে ‘শক্তির ভারসাম্য’ এবং ‘রাষ্ট্রকেন্দ্রিক স্বার্থ’কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের এই ‘শান্তি পরিষদ’ বিশ্বজুড়ে চলমান সংকট নিরসনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, নাকি এটি কেবলই একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হয়ে থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই উদ্যোগ যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
রিপোর্টারের নাম 























