বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটার পর এই প্রথম দেশের সাধারণ জনগণ তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ও উন্মুক্ত পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। প্রায় পাঁচ কোটি নতুন ভোটার, যাদের একটি বড় অংশ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল, এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে প্রস্তুত। ফলে এবারের নির্বাচন যে অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে ভিন্ন হবে, তা সহজেই অনুমেয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গভীর প্রভাব
এই নির্বাচনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও চেতনা। ওই আন্দোলনে অসংখ্য তরুণ প্রাণ হারিয়েছে, বহু মানুষ আহত হয়ে আজও যন্ত্রণার সঙ্গে বেঁচে আছে। এই আন্দোলন ছিল বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত। জনগণ নতুন করে দমন-পীড়ন, গুম-খুন ও স্বৈরাচারী রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না। শহীদদের পরিবারগুলোও চায় না দেশ আবার অন্ধকারে নিমজ্জিত হোক। এই সম্মিলিত অনুভূতিই ভোটের বাক্সে শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। শহীদ ওসমান হাদির মতো বীরদের স্বপ্ন ছিল প্রতিশোধের বদলে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা; তাঁর শাহাদতের শোক আজ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রাজনৈতিক জবাব হয়ে ওঠার অপেক্ষায়।
দুই নেত্রীর অনুপস্থিতি ও নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে
১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—এই দুই নেত্রীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর এই নির্বাচনই প্রথম যেখানে ভোটাররা এই দুই প্রভাবশালী নেত্রীর প্রত্যক্ষ প্রভাব ছাড়াই ভোট দিচ্ছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতিতে অভ্যস্ত ভোটারদের জন্য এটি একটি বড় পরিবর্তন। যারা অতীতে দল নয়, নেত্রীকে দেখে ভোট দিয়েছেন, তারা এবার নীতি, আদর্শ ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবেন।
তরুণ, নারী ও প্রবাসী ভোটারদের সম্মিলিত শক্তি
মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ‘জেন-জি’ প্রজন্ম। এই তরুণরা দলীয় অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া এই তরুণরাই এবার ভোটকেন্দ্রে যাবেন নিজেদের বিবেকবোধ অনুযায়ী, কোনো পরিবার বা সামাজিক চাপে নয়। যাদের পক্ষে এই বিশাল তরুণ ভোটারদের সমর্থন যাবে, তাদের বিজয় ঠেকানো কঠিন হবে।
একইভাবে, এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের সংখ্যাও প্রায় অর্ধেক। বিগত দমন-পীড়নের নীরব সাক্ষী এই নারীরা—অনেকে সন্তান হারিয়েছেন, অনেকে স্বামী বা স্বজন হারিয়েছেন। তাদের ক্ষোভ ও বেদনা ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে বলেই ধারণা করা যায়। অতীতের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোয় নারীদের অংশগ্রহণ ও ভোটের ধারা তার প্রমাণ।
এই প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা বিদেশে বসেই জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই ভোটারগোষ্ঠী তাদের অধিকার ও সমস্যার কথা যারা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবে, তাদের প্রতিই ঝুঁকবে। কয়েক লাখ প্রবাসী ভোট নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্নীতি, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন
জুলাই অভ্যুত্থানের পরও পুরোনো চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির চর্চা অব্যাহত থাকলে জনগণের হতাশা আরও বাড়বে। এই হতাশা ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। এবারের নির্বাচনে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থীকে নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং প্রশ্ন তুলছে, যারা জনগণের কোটি কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাৎ করেছেন, তারা কীভাবে দেশের সেবা করবেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তিরা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। অথচ দেখা যাচ্ছে, কেউ কেউ এই বিষয়টি গোপন করে অথবা প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে বৈধতা আদায়ের চেষ্টা করছেন। এমন আচরণকে সাধারণ জনগণ নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছে। ফলে সামনের নির্বাচনে ঋণখেলাপি কিংবা দ্বৈত নাগরিকত্বসম্পন্ন প্রার্থীদের কাছ থেকে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
পুরনো বয়ান বনাম নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা
দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে যারা আবারও একমাত্র রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কেবল মুক্তিযুদ্ধের পুরোনো বয়ান হাজির করবেন, তাদের কাছ থেকে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। সাধারণ মানুষ আজ মুক্তি চায়; তারা চেতনার নামে শোষণ চায় না। যে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, সেই ভোটাধিকার বিগত ৫৫ বছরেও পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি—এই বাস্তবতা জনগণ ভোলেনি। তাই মানুষ আর পুরোনো বয়ান শুনে বিভক্ত হতে চায় না; তারা চায় বাস্তব সমাধান, কার্যকর সংস্কার ও মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক জীবন।
গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নির্বাচনি সমীকরণ
এবারের নির্বাচনে মূলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখবে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে মানুষ এখন রাজনীতির খবর, বিশ্লেষণ ও বিতর্ক অনুসরণ করছে। আগের মতো তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়, ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করে ভোটাররা নিজস্ব সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।
নির্বাচনি সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে বিভিন্ন আসনে বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি। ৭৯ আসনে বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী এবং জামায়াতের একজন প্রার্থীর খবর পাওয়া গেছে। বড় দলগুলোর ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইকে আরও তীব্র করবে। এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
নেতৃত্বের প্রশ্ন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
বর্তমান রাজনীতিতে একক নেতৃত্বের আলোচনায় তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমানের মতো নামগুলো সামনে আসছে। নেতৃত্বের কার্যকারিতা, মাঠের উপস্থিতি, সংস্কারের বিষয়ে অবস্থান—এসব বিষয় ভোটাররা গভীরভাবে মূল্যায়ন করবেন।
বিভিন্ন জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে ভোটের পুরোনো মেরূকরণ ভেঙে গেছে এবং ইসলামপন্থি ও বাংলাদেশপন্থি ভোটের নতুন বিন্যাস তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলও এই নির্বাচন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সব মিলিয়ে দেশের আপামর জনগণের প্রত্যাশা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কোনো ধরনের নির্বাচন প্রকৌশলের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণের চেষ্টা হলে দেশ আবারও সংকটে পড়তে পারে। জনগণের ম্যান্ডেটই একমাত্র বৈধতা—এ সত্য অতীতে প্রমাণিত হয়েছে। এই নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু হয়, তবে তা শুধু সরকার নয়, দেশ ও জনগণকেই বিজয়ী করবে।
রিপোর্টারের নাম 























