স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দলের অভাব দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এই শূন্যতা দেশের গণতান্ত্রিক বিবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। কেন এই শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে উঠল না, তার পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে কী আশা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: নেতৃত্বের ভুল ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাব
স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি শিশুর মতো নবীন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর সময়ে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা হয়তো সেভাবে অনুভূত হয়নি। কিন্তু এই অভাব পরে বড় আকার ধারণ করে। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ এবং কিছু নেতার মানসিকতা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের সদস্যদের সংখ্যা কম রাখা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ভিন্নমত প্রকাশের সুস্থ পরিবেশ তৈরি হয়নি।
পরবর্তীকালে, দেশ এক নতুন রাজনৈতিক বাঁক নেয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, সামরিক শাসনের অধীনে কিছু নেতার উত্থান ঘটে। এই সময়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। কিছু নেতা নিজের মতো করে দল গঠন এবং রাজনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, যা সুস্থ গণতন্ত্রের পরিপন্থী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং অতীতকে ক্ষমা করার প্রবণতা পরবর্তীতে আরও বড় সংকট ডেকে এনেছে। “বাকশাল-১” কে ক্ষমা করার ফল ভালো হয়নি, এবং “বাকশাল-২” এর পরিণাম আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সামরিক শাসনামলের প্রভাব এবং রাজনৈতিক দলের জন্ম
স্বাধীনতার পর সামরিক শাসনের অধীনে রাজনীতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। এই সময়ে, কিছু রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিল বিএনপি। জানা যায়, এই দলটি এক চিমটি বামপন্থী, এক মুঠো মুক্তিযোদ্ধা এবং এক জগ ডানপন্থীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। তবে, এই দলের সৃষ্টি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কিছু এলিট বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, যারা বামপন্থী চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা এই দলকে সহজে গ্রহণ করেননি। তাদের মতে, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে ‘বাকশাল’ তখনও বিদ্যমান ছিল এবং তা চিন্তা ও ভাবনার জগৎকে প্রভাবিত করেছে। এই ধারা ‘এক-এগারো’ ঘটনার জন্ম দিয়েছিল এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল জিয়ার বিএনপিকে ধ্বংস করা।
নতুন প্রজন্মের আশা ও ‘অন্যরকম বাংলাদেশ’
সাম্প্রতিক সময়ে, নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ‘অন্যরকম বাংলাদেশ’ গড়ার আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে। জাইমা রহমানের মতো তরুণ নেতারা এই পরিবর্তনের প্রতীক। তাঁরা একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। জাইমা রহমান বলেছেন, “আমরা অন্য রকম একটা বাংলাদেশ গড়ব।” তাঁর এই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক চর্চায় স্বচ্ছতা।
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে বিরোধী দল হিসেবে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে, বিএনপির ইশতেহারে এই বিষয়ে তেমন কোনো বক্তব্য নেই। নতুন প্রজন্মের নেতারা যদি সত্যিই ভিন্ন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখান, তবে তাদের গণতান্ত্রিক সহনশীলতা, শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা, নীতি ও কর্মসূচির স্বচ্ছতা এবং নেতৃত্বের জবাবদিহির মতো বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
জাইমা রহমান তাঁর শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছেন যে, গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে খ্যাত ব্রিটেনে বিরোধী দল সরকারেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি যদি তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন, তবে তিনি বাবার সহযোগী হিসেবে দলকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে পারবেন এবং একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে সহায়তা করতে পারবেন।
ভবিষ্যতের পথ: সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা
স্বাধীনতার পর থেকে যে রাজনৈতিক বৈরিতা লালন করা হয়েছে, তা রাষ্ট্র ও সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে, দুটি বিবদমান রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। অনেকে মনে করেন, এই সহনশীলতা জামায়াতকে রক্ষা করার জন্য, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা জামায়াতের কম নয়, বরং বাধা পেলেই তারা আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়েছে।
বিএনপির ভেতরে যে অংশটি জামায়াতকে বিরোধী দল হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিল না, তারাই এই দলটিকে অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। আজকের নির্বাচনে যদি জামায়াত ক্ষমতায় যায় বা তার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তবে তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বিএনপির সেই নেতৃত্বের।
নতুন প্রজন্ম হয়তো সেই পরিবর্তন আনতে পারবে যা পূর্ববর্তী প্রজন্ম পারেনি। তাদের স্বপ্ন এবং উদ্যোগ একটি উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, যেখানে শক্তিশালী বিরোধী দলের পাশাপাশি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা সম্ভব হবে। ছোট ছোট অনেক স্বপ্ন দিয়েই প্রিয় মাতৃভূমিটি গড়ে উঠবে, এই বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 























