ঢাকা ১১:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনীতির বাঁকবদল: পুরোনোদের সংকটে নতুন শক্তির হাতছানি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৫৪:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের চেনা সমীকরণগুলো বদলে গিয়ে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দেশ। একদিকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে সৃষ্ট জন-অসন্তোষ এবং অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাংগঠনিক স্থবিরতা ও নেতৃত্বসংকট—সব মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে একটি সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে ইসলামি দলগুলো, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই দলটিই রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষক মহলে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ‘ইমাজিন্ড কমিউনিটিজ’ ধারণার আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ দেশের মানুষের বৃহত্তর পরিচয় মূলত ধর্মীয় মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যথাক্রমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি জাতীয়তাবাদের কার্ড ব্যবহার করলেও, জামায়াত সরাসরি ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছে। বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ যখন প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার প্রতি বীতশ্রদ্ধ, তখন এই ধর্মীয় ও আদর্শিক পরিচয় তাদের কাছে নতুন একটি বিকল্প হিসেবে ধরা দিচ্ছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ বিস্তারেও জামায়াত মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ যে বয়ান তৈরি করেছিল, দুর্নীতি ও বিবিধ বিতর্কে তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে, বিএনপি কোনো নতুন আদর্শিক বয়ান তৈরি করতে না পারায় অনেকটা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে আটকে গেছে। এই সুযোগে জামায়াত নিজেদের ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’ ও ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধী’ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ভারতবিরোধী যে জনমত তৈরি হয়েছে, সেটিকে জামায়াত কৌশলগতভাবে নিজেদের পালে হাওয়া হিসেবে ব্যবহার করছে।

সাংগঠনিক সক্ষমতার বিচারেও জামায়াত বর্তমানে অন্য যেকোনো দলের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। রবার্ট মিশেলসের ‘আয়রন ল অব অলিগার্কি’ অনুযায়ী, বড় দলগুলোর ক্ষমতা যখন নির্দিষ্ট কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত হয়, তখন সেখানে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই সংকটে ভুগলেও জামায়াত-শিবির দীর্ঘ নিপীড়নের মধ্যেও তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তাদের চেইন অব কমান্ড এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া সচল রেখেছে। শিক্ষিত ও তরুণ নেতৃত্বের আধিক্য তাদের সাংগঠনিকভাবে অধিকতর প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও দলটি নতুন বয়ান হাজির করছে। প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে ইসলামি ব্যাংকিং, জাকাতভিত্তিক পুনর্বণ্টন ও সুদমুক্ত অর্থনীতির ধারণা সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করছে। এছাড়া নারী ভোটারদের ক্ষেত্রেও তারা কৌশল পরিবর্তন করেছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখেও নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে একটি নীরব সমর্থন গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে।

৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তরুণ প্রজন্মের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন আর গতানুগতিক ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। জামায়াত নিজেকে গ্রিক দর্শনের ‘থিসিউসের জাহাজ’-এর মতো আমূল বদলে ফেলার দাবি করছে। অর্থাৎ, কাঠামোগতভাবে পুরোনো মনে হলেও তারা ভেতর থেকে নতুন চিন্তাধারা ও আধুনিক রাজনৈতিক কৌশলে সজ্জিত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াত ও শিবিরের জনসমর্থন বিএনপির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি সুসংহত।

তবে এই সম্ভাবনার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলটির ঐতিহাসিক দায়ভার এবং অতীত রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক। এই বিতর্ক কাটিয়ে তারা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক হতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত জামায়াত কি সত্যিই একটি আধুনিক ও জনবান্ধব রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে, নাকি এটি কেবলই কৌশলী রূপান্তর—তা আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল এবং জনগণের রায়েই প্রতিফলিত হবে। তবে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে এবং সেই হাওয়ায় জামায়াতে ইসলামী এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চোর আটক ঘিরে রণক্ষেত্র রায়পুর: পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে আহত ২০, সড়ক অবরোধে ভোগান্তি

রাজনীতির বাঁকবদল: পুরোনোদের সংকটে নতুন শক্তির হাতছানি

আপডেট সময় : ১০:৫৪:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের চেনা সমীকরণগুলো বদলে গিয়ে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দেশ। একদিকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে সৃষ্ট জন-অসন্তোষ এবং অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাংগঠনিক স্থবিরতা ও নেতৃত্বসংকট—সব মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে একটি সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে ইসলামি দলগুলো, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই দলটিই রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষক মহলে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ‘ইমাজিন্ড কমিউনিটিজ’ ধারণার আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ দেশের মানুষের বৃহত্তর পরিচয় মূলত ধর্মীয় মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যথাক্রমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি জাতীয়তাবাদের কার্ড ব্যবহার করলেও, জামায়াত সরাসরি ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছে। বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ যখন প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার প্রতি বীতশ্রদ্ধ, তখন এই ধর্মীয় ও আদর্শিক পরিচয় তাদের কাছে নতুন একটি বিকল্প হিসেবে ধরা দিচ্ছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ বিস্তারেও জামায়াত মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ যে বয়ান তৈরি করেছিল, দুর্নীতি ও বিবিধ বিতর্কে তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে, বিএনপি কোনো নতুন আদর্শিক বয়ান তৈরি করতে না পারায় অনেকটা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে আটকে গেছে। এই সুযোগে জামায়াত নিজেদের ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’ ও ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধী’ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ভারতবিরোধী যে জনমত তৈরি হয়েছে, সেটিকে জামায়াত কৌশলগতভাবে নিজেদের পালে হাওয়া হিসেবে ব্যবহার করছে।

সাংগঠনিক সক্ষমতার বিচারেও জামায়াত বর্তমানে অন্য যেকোনো দলের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। রবার্ট মিশেলসের ‘আয়রন ল অব অলিগার্কি’ অনুযায়ী, বড় দলগুলোর ক্ষমতা যখন নির্দিষ্ট কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত হয়, তখন সেখানে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই সংকটে ভুগলেও জামায়াত-শিবির দীর্ঘ নিপীড়নের মধ্যেও তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তাদের চেইন অব কমান্ড এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া সচল রেখেছে। শিক্ষিত ও তরুণ নেতৃত্বের আধিক্য তাদের সাংগঠনিকভাবে অধিকতর প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও দলটি নতুন বয়ান হাজির করছে। প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে ইসলামি ব্যাংকিং, জাকাতভিত্তিক পুনর্বণ্টন ও সুদমুক্ত অর্থনীতির ধারণা সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করছে। এছাড়া নারী ভোটারদের ক্ষেত্রেও তারা কৌশল পরিবর্তন করেছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখেও নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে একটি নীরব সমর্থন গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে।

৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তরুণ প্রজন্মের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন আর গতানুগতিক ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। জামায়াত নিজেকে গ্রিক দর্শনের ‘থিসিউসের জাহাজ’-এর মতো আমূল বদলে ফেলার দাবি করছে। অর্থাৎ, কাঠামোগতভাবে পুরোনো মনে হলেও তারা ভেতর থেকে নতুন চিন্তাধারা ও আধুনিক রাজনৈতিক কৌশলে সজ্জিত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াত ও শিবিরের জনসমর্থন বিএনপির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি সুসংহত।

তবে এই সম্ভাবনার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলটির ঐতিহাসিক দায়ভার এবং অতীত রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক। এই বিতর্ক কাটিয়ে তারা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক হতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত জামায়াত কি সত্যিই একটি আধুনিক ও জনবান্ধব রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে, নাকি এটি কেবলই কৌশলী রূপান্তর—তা আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল এবং জনগণের রায়েই প্রতিফলিত হবে। তবে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে এবং সেই হাওয়ায় জামায়াতে ইসলামী এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।