বাংলাদেশের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ‘বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো’ (বিএনএফকিউ) উপদেষ্টা পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে। আট বছর ধরে দীর্ঘ গবেষণা, কর্মশালা ও নীতিগত আলোচনার পর এই কাঠামোর অনুমোদন বাংলাদেশের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল। এর মূল লক্ষ্য হলো দেশের অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও শিখনফলকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে মানসম্মত করা, যাতে দেশের নাগরিকেরা দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
বিশ্বায়নের এই যুগে একটি দেশের উন্নয়নে দক্ষতা ও শিক্ষার মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনএফকিউ সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ধারার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন করবে। এর ফলে শিক্ষার্থী ও কর্মীদের চলাচল সহজ হবে, এক শিক্ষা স্তর থেকে অন্য স্তরে ক্রেডিট স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক সনদের সমপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। এই কাঠামো চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের সনদ ও ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং আজীবন শেখার পথ সুগম হবে। এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার তিন ধারার মধ্যে সমন্বিত সংযোগ স্থাপন করে এক স্তর থেকে অন্য স্তরে অগ্রগতির সুস্পষ্ট পথ তৈরি করবে।
ইতিমধ্যে এই কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) বিএনএফকিউ-এর লেভেল ১ থেকে ৫ অনুযায়ী সনদ প্রদান শুরু করেছে, যা দক্ষতা খাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বড় ভূমিকা রাখছে। একইভাবে, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিএনএফকিউ-কে গ্রহণ করেছে। ফলস্বরূপ, দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি, কারিকুলাম ও শিক্ষণফল নির্ধারণে ধীরে ধীরে বিএনএফকিউ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া দেশের উচ্চশিক্ষা ও অর্জিত দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে সহায়তা করবে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশের শিক্ষা ও বিদেশে কর্মসংস্থানে পড়বে।
বিএনএফকিউ কোনো একক কাঠামোর অনুকরণে তৈরি হয়নি; বরং এটি বিশ্বের ৪১টি জাতীয় ও আঞ্চলিক যোগ্যতা কাঠামো, যেমন ইউরোপিয়ান কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক, আসিয়ান কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক, অস্ট্রেলিয়া, স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনসহ বহু দেশের কাঠামো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ২০১৮ সাল থেকে একটি উচ্চ পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি এবং ৭টি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছিল, যেখানে ৪৫টির বেশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। প্রায় ৯৫টির বেশি কর্মশালা, সংলাপ ও নীতিগত বৈঠকের ফলেই এটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সমন্বয়ে একটি উপযোগী কাঠামো তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
এই কাঠামো দেশের শিক্ষা ও দক্ষতা খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে, যা সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা—তিন ধারার শিক্ষাকে এক ছাতার নিচে সমন্বিত করবে। এর ফলে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি ও সাফল্যের পথ হবে আরও স্বচ্ছ ও পূর্বনির্ধারিত এবং দক্ষ জনশক্তির গতিশীলতা বাড়বে। প্রত্যাশা করা যায়, এই কাঠামো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, দক্ষতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ গঠন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশকে আরও শক্ত ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রিপোর্টারের নাম 

























