বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কেবল বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা ও বহিরাগত আধিপত্যবাদের জটিল এক আখ্যানও বটে। পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফরের ষড়যন্ত্র থেকে শুরু করে আজকের দিনেও জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্নে শত্রু-মিত্র নির্ধারণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্বাধীনতার প্রকৃত মর্মার্থ উপলব্ধিতে বারবারই একশ্রেণির দালাল ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে যখন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়ছিল, তখন এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বই ছিল মুখ্য বিষয়। অথচ পার্শ্ববর্তী সাধারণ মানুষ এটিকে নিছকই রাজায় রাজায় যুদ্ধ ভেবে নীরব দর্শক ছিল। পরবর্তীকালে এক ব্রিটিশ ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন, সেদিন যদি সমবেত দেশীয় জনগণ একটি পাথরও ছুড়ে মারত ব্রিটিশ বাহিনীর দিকে, তাহলে বাংলাসহ পুরো ভারতের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। পলাশীর পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা ‘অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা’কে দায়ী করেন, যেখানে মীরজাফরসহ নবাবের এককালের অনুগতদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র ব্রিটিশ বাহিনীর সামরিক কৃতিত্বকেও ম্লান করে দিয়েছিল।
প্রায় এক শতাব্দী পর, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে যখন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন একশ্রেণির শিক্ষিত বাঙালি এর বিরোধিতা করে। এ সময়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৮) ও হিন্দু কলেজ (১৮১৭) প্রতিষ্ঠা করা হয়। কার্ল মার্কস যাকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, সে সময়েই দেশীয় একশ্রেণির মধ্যে ইংরেজি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ব্রিটিশদের অধীনে চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরির আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকও এই শিক্ষাব্যবস্থার পেছনে ব্রিটিশদের নিজস্ব কর্মচারী তৈরির প্রয়াসকে দায়ী করেছেন। এর মধ্য দিয়ে পরাধীনতার দালাল হওয়ার যে প্রবণতা, তা যুগে যুগে একশ্রেণির কর্ম ও ধর্মে পরিণত হয়।
১৭৬৩ সাল থেকে শুরু হওয়া বাংলার কৃষক আন্দোলন ও সংগ্রাম, যা দশক থেকে শতাব্দীকাল ধরে চলেছিল, তাও ছিল অসাম্প্রদায়িক ও ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে। শমসের গাজী, ভবানী পাঠক, ফকির মজনু শাহ, মুসা শাহ ও দেবী চৌধুরানীর মতো নেতৃত্বাধীন এই কৃষকরা হয়তো ঔপনিবেশিকতার কাঠামোগত মর্মার্থ বুঝতে পারেননি, কিন্তু তারা ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন যে দেশ আর তাদের হাতে নেই, পরাধীন হয়ে গেছে। হাজার হাজার কৃষক এই সংগ্রামে শহীদ হয়েছিলেন, কিন্তু তাদের কথা ইতিহাসে তেমনভাবে স্থান পায়নি। এই কৃষক আন্দোলন দমনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার সপক্ষে দাঁড়িয়েছিল আমাদের দেশীয় জমিদার, কৃষিভিত্তিক অভিজাত ও ধনিক শ্রেণি। এই কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবিত্তরাই রেনেসাঁর মালিক-মোক্তার সেজেছিল, যাদের অর্থের জোগান দিত এ দেশের গরিব কৃষককুল। এভাবেই ইতিহাস বারবার নায়ককে ভিলেন আর ভিলেনকে নায়ক বানিয়েছে।
ব্রিটিশদের নীলচাষ ও নীলকরদের অত্যাচার বাংলার ইতিহাসের এক নির্মমতম অধ্যায়। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬২ সাল পর্যন্ত চলা নীল বিদ্রোহে কৃষকদের তীব্র আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনকে টলিয়ে দিয়েছিল। এই সময়ে কলকাতার বিলাসী জমিদার ও অভিজাত ধনিক শ্রেণির ১০১ জন ব্যক্তি ব্রিটিশ রানির দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে এই ‘সন্ত্রাসী আন্দোলন’ দমনের দাবি জানায় এবং প্রয়োজনে নিজেদের সবটুকু দিয়ে আত্মনিয়োগ করার প্রত্যয় ঘোষণা করে। নীল বিদ্রোহের কৃষকদের সন্ত্রাসী বলতেও তাদের দ্বিধা হয়নি। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ নাটক, হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখার্জির কিছু লেখা এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নৈতিক সমর্থন ছাড়া নীলকর সংগ্রামী কৃষকদের পাশে আর কেউ দাঁড়ায়নি।
১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনকে ব্রিটিশ শাসকরা ভূমি ব্যবস্থাপনা ও কর বৃদ্ধির কৌশল বললেও এটি ছিল এক গভীর রাজনৈতিক কূটকৌশল। এর মাধ্যমে এতদিনকার ভূমির স্বভোগী মুসলমান জমিদার, তালুকদারসহ একটি বিশাল শ্রেণিকে হটিয়ে অনগ্রসর শ্রেণিতে রূপান্তরিত করা হয়। এর ফলে কলকাতার লবণ ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ ঠাকুররা রাতারাতি জমিদার হয়ে ওঠেন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী রাম মোহন রায় ১৮৩১ সালে ‘রাজা’ উপাধি পান। এই ঘটনাগুলো জাল ইতিহাস রচনার পথ প্রশস্ত করে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিপ্লবী চেতনার প্রতীক সিরাজ সিকদারকে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে দলের ভেতরেরই একজনের নাম শোনা যায়। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা চারু মজুমদারকেও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই এ দেশে ও অঞ্চলে জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিপ্লবকে যুগে যুগে হত্যা করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে বিপ্লবী বীরদের।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার অবসান এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশ গঠিত হলেও ঔপনিবেশিক কাঠামো একই রয়ে যায়, কেবল শাসক বদল হয়। ফরাসি দার্শনিক ফ্রান্স ফ্যানন এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, ঔপনিবেশিক আধিপত্য শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বরং এটি ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব ও আত্মপরিচয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, যা মানসিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য রাজনৈতিক বিপ্লবের পাশাপাশি মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবও প্রয়োজন।
এই বিপ্লবের বদলে পাকিস্তানে ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার হতে থাকে। মানবিক ও প্রতিরক্ষা সাহায্যের হাত ধরে ১৯৫৪-৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সেন্টো ও সিয়াটোর মতো প্রতিরক্ষা জোটে অংশগ্রহণ দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর করে তোলে। এই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি এবং যেকোনো সাম্রাজ্যবাদ, নব্য-ঔপনিবেশিকতা বা আধিপত্যবাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিল কৃষক, শ্রমিক, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তারা মুক্তিযুদ্ধকে ভাত, কাপড়, বাসস্থানসহ নিত্যদিনের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং কারো গোলামি না করার নিশ্চয়তা অর্জনের বিপ্লব হিসেবে দেখেছিলেন। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি বিপ্লব ও বিজয়ের স্বপ্ন, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার এবং একটি নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন একটি দেশ অর্জন। এটাই ছিল সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
কিন্তু উপনিবেশ-উত্তরকালে কতিপয়ের শাসন বিদ্যমান থাকায় তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরাধীনতা ও ভিনদেশি আধিপত্যবাদনির্ভর হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংবিধানের লিখিত শব্দমালা বা কথামালা নয়, তাদের কাছে চেতনায় থাকে ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তার স্বপ্ন ও তার বাস্তবতা। কেবল শাসক বদল নয়, শাসনব্যবস্থার বদল, সরকার প্রভু নয় এবং জনগণ দয়া প্রার্থী ভৃত্য নয়—এটাই তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এসে সাধারণ মানুষ বিশাল ধাক্কা খায় এই বলে যে, তাদের একান্ত আপন মুক্তিযুদ্ধ নামের বিপ্লবকে ছিনতাই করে নিয়ে গেছে নতুন এক শাসক বা নতুন প্রভু। জরুরি অবস্থা জারি, একদলীয় শাসন, সংবাদপত্র বন্ধ হওয়া, রক্ষীবাহিনী ও মুজিববাহিনীর আবির্ভাব এবং এর ওপর নিদারুণ দুর্ভিক্ষ হয়ে যায় বাস্তব।
এসবের ওপর পররাষ্ট্রনীতি একদেশনির্ভর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ নব্য এক আধিপত্যবাদের কবলে পড়ে। পঁচিশ বছরের মৈত্রী চুক্তির কথা আমাদের জানা থাকলেও, ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আট দফার এক অসম বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা অনেকেরই অজানা। এই চুক্তি এতটাই অসম ছিল যে, তৎকালীন ছাত্রলীগের একাংশ (যা পরবর্তীকালে জাসদ) মন্তব্য করেছিল, ‘অর্থনৈতিক আকাশে অশুভ নক্ষত্রের অভ্যুদয় ঘটছে।’ ভারতের আদলে বাংলাদেশে রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়, যার গঠন ও কার্যক্রম ছিল সে দেশের সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ (সিআরপি)-এর আদলে, যা গঠিত হয়েছিল বামপন্থি ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্মূল করার জন্য। আরও আশ্চর্যান্বিত হতে হয় যে, বিতর্কিত মুজিববাহিনীর প্রধান ব্যক্তি জেনারেল এসএস উবানকে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান ব্যক্তি তার ‘ব্যক্তিগত উপদেষ্টা’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কার্যত রক্ষীবাহিনীসহ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার কাজ অর্থাৎ জেনারেল উবানই ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। (মেজর জেনারেল এসএস উবানের গ্রন্থ ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগং, দি ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ’ অবলম্বনে)।
এসব ঘটনা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ঘটেছিল, এবং এটি পুরো চিত্র নয়, মাত্র কয়েকটি উদাহরণ। এসব ঘটনা বুঝতে না পারলে আমরা উপলব্ধি করতে পারব না যে, বাংলাদেশ এক উনুন থেকে আরেক উনুন, অর্থাৎ ‘আউট অব দ্য ফ্রাইং প্যান ইনটু ফায়ার’ পরিস্থিতিতে পড়েছে। পাকিস্তানের উনুনের হাত থেকে রক্ষা পেতে আমরা জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে পড়েছি।
এ প্রসঙ্গে চাণক্যের দুটি উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিক: ক. নিকট রাজ্য স্বাভাবিকভাবেই শত্রু হয়ে যায়। খ. কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই তারা বন্ধু হতে চায়। নিকোলো মেকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে পররাজ্যের সাহায্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, কেউ সাহায্যের জন্য অনুরোধ করে এদের আনলে তা সবসময়ই বিপজ্জনক হবে। কারণ পরাজিত হলে তার কিছুই করার থাকে না, আর বিজয়ী হলে সেই বাহিনীর কাছে তিনি (শাসক) জিম্মি হয়ে যান।
এতক্ষণ যে কথাগুলো বলা হলো, তার বাস্তবতা উপলব্ধি না করলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়বে – এ কথা নিশ্চিত। আধিপত্যবাদী শক্তির আগ্রাসন চলমান আছে এবং যতক্ষণ না তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা চলমান থাকবে। স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সবটা সময় (সামান্য বৈরী সময় ছাড়া) আধিপত্যবাদবেষ্টিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রয়েছে। আধিপত্যবাদ তার কর্মপদ্ধতি ও কৌশল পরিবর্তন করে আরও ক্ষুরধার ও শানিত করেছে মাত্র। এরই ধারাবাহিকতায় স্বৈরশাসক এরশাদ, ১/১১-এর নেপথ্যের কারিগরদের দিয়ে চেষ্টা ব্যর্থ হলেও ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তারা সফল হয়েছে।
বাংলাদেশ এবং এর জনগণ সমতার ভিত্তিতে প্রতিবেশী যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক চায়। বাংলাদেশের জনগণ, ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কে বিশ্বাসী তো নয়ই, বরং এর ঘোরতর বিরোধী। আর বিপত্তিটা সেখানেই। ব্যক্তি একটি সত্তা অথবা একক অস্তিত্ব ও একমাত্রিক। রাষ্ট্র জনগণের স্বাধীন, সার্বভৌম সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সংস্থা এবং এটি বহুমাত্রিক। ব্যক্তিসত্তাকে জনগণের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক আলাদা অস্তিত্বের সঙ্গে তুলনা কোনো যুক্তি, বিজ্ঞান বা কোনো স্বার্থই সমর্থন করে না। সংকটটা এখানেই। এটাকে বড়জোর শক্তি দিয়ে যা ইচ্ছা তাই করার মানসিকতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই মানসিকতা যতদিন না দূর হবে, সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
শক্তি দিয়ে অবৈধকে বৈধ করার জন্য একটি শ্রেণি প্রয়োজন, তারও আয়োজন তারা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে। আর ওই শক্তির মাধ্যমে যা ইচ্ছা করার মানসিকতার পক্ষে ভুয়া বা জাল বয়ান তত্ত্ব (Fake narrative theory) ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এ কারণেই তাদের মধ্যে ২০২৪ সালের তথাকথিত ‘জুলাই বিপ্লব’ ভীতি ধরিয়ে দেয়। জুলাই বিপ্লব বিশ্বমান কাঠামোর পরিবর্তে জনঅংশীদারত্বমূলক ‘নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ কথা বলে। আধিপত্যকামী শক্তির কাছে জুলাই এক আতঙ্কের নাম।
জুলাই বিপ্লব পরাধীনতা না প্রকৃত স্বাধীনতা, তার রাজনৈতিক ব্যারোমিটার অথবা জনমতের রাজনৈতিক সূচক। এই নির্বাচনই হবে এই রাজনৈতিক বিভাজনের ভিত্তিতে। এই নির্বাচনের প্রধান এজেন্ডা কে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে নয়। নির্বাচন হবে হুমকি মোকাবিলা এবং এই লক্ষ্যে সক্ষম জাতীয় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তাকৌশল উপলব্ধির ভিত্তিতে এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির নিরিখে। যারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবসকে ‘পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে’ ভারতের ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে দেখবে, ২০২৪ সালের জুলাই শহীদদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করবে, তারা এবং তাদের দালাল শ্রেণি বাংলাদেশের বন্ধু কোনোদিনই হবে না।
লেখার শুরুতেই পলাশীর যুদ্ধ, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, কৃষক এবং নীলকর সংগ্রামসহ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেছি। এবারের নির্বাচনেও সেভাবে দালালশ্রেণি থাকবে, যারা ওই একই ভূমিকা যুগে যুগে পালন করেছে। আর ভুয়া বয়ানের কারণে জনগণ বিভ্রান্ত হয়েছে। এই নির্বাচনও একটি যুদ্ধ এবং এটি জাতি হিসেবে টিকে থাকার, স্বাধীন থাকার, মাথা উঁচু করে নিজ বাসভূমিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার যুদ্ধ। তাই আসুন, আমরা দেশের পরাধীনতার এবং স্বাধীনতার শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করি। আর তা করতে হবে এই নির্বাচনেই।
রিপোর্টারের নাম 

























