শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আশ্রয় দেওয়া, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের হস্তক্ষেপ এবং দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে ‘ভারত আউট’ স্লোগান তুলেছে ‘জুলাই ঐক্য’। শনিবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে সংগঠনটি এই কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত অব্যাহতভাবে হস্তক্ষেপ করে চলেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেও এমন ষড়যন্ত্র চলছে বলে তারা দাবি করেন। তাদের মতে, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে জড়িত এবং শহীদ ওসমান হাদির খুনিদের ভারত আশ্রয় দিচ্ছে। একইসঙ্গে, গত চারটি জাতীয় নির্বাচন এবং আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভারতের “নগ্ন হস্তক্ষেপ” চলছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
বক্তাদের মতে, গত ৫৪ বছর ধরে ভারত সরাসরি যুদ্ধ না করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ, সীমান্তে নদীর বাঁধ খুলে দিয়ে বন্যা সৃষ্টি এবং পানিবণ্টন চুক্তি না করার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরে তারা বলেন, ভারত কখনোই বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে আচরণ করেনি।
সমাবেশ থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ‘ইন্ডিয়া বয়কট’ করার আহ্বান জানানো হয় এবং দেশবাসীকে এই আন্দোলনে শামিল হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। বক্তারা আসন্ন নির্বাচনকে একটি ‘সিলেকশন’ প্রক্রিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং অভিযোগ করেন যে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসানোর আয়োজন করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন বলেন, ভারতের প্রভাবে বাংলাদেশকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) ব্যঙ্গ করে ‘ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল’ বলে উল্লেখ করেন। শিলংয়ে বাংলাদেশ ফুটবল দলের অনুশীলনের সময় আলো নিভিয়ে দেওয়ার ঘটনাকেও তিনি ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। এছাড়াও, নির্বাচনকালীন শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনসিসি ক্যাডেটদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি।
ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণ আর কোনো সাজানো বা নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদের সুযোগ দেবে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে একটি সুসংগঠিত চক্রান্ত চলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন, যার উদ্দেশ্য হলো জুলাইয়ের গণজাগরণকে দমন করা। তবে, ছাত্র-জনতা এখন এই চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন এবং প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত বলে তিনি জানান। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ভারত তার প্রভাব ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে, যার ফলে বাংলাদেশকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশকে বারবার শুধু ভারতেই খেলতে চাপ দেওয়া হয় এবং ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন অগ্রাহ্য করা হয়, যা ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের স্পষ্ট উদাহরণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের এই লড়াই চলমান থাকবে এবং এই সংগ্রামের ‘সিপাহসালার’ ছিলেন শহীদ উসমান হাদি। উসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সাথেও ভারত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সাম্প্রতিক পুলিশি হামলার বর্ণনা দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য রিয়াদুল ইসলাম যুবা বলেন, গতকাল জুলাইয়ের আদলে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, আটকে রাখা পাঁচজন সহযোদ্ধার খোঁজ নিতে গেলে যৌথ বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে তিনি এবং অন্যেরা নির্যাতিত হন। তাদের মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, এই হামলায় জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ রয়েছে এবং হামলাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। তিনি আরও জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলেও, হামলার নির্দেশদাতা ও জড়িত সকলকে কঠোর রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় আনার দাবি রাখেন।
সমাবেশে যোগ দিয়ে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, সরকার লোক দেখানো সহানুভূতি দেখালেও এখনো শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তিনি বলেন, দেশীয় তদন্ত সংস্থার ওপর আস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক তদন্ত ছাড়া ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের দাবি:
সমাবেশে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানানো হয়। বক্তারা দেশীয় তদন্ত সংস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছেন উল্লেখ করে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানান। ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা বলেন, উসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং এই ঘটনার তদন্ত জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানেই করতে হবে। কেননা দেশীয় তদন্ত প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই আন্তর্জাতিক তদন্তই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য পথ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের ওপর আর কোনো দেশের হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না। ১৮ কোটি মানুষের শক্তি এবং তরুণ সমাজের ঐক্যের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, প্রয়োজনে রাজপথেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। এসময় ‘ভারত আউট’, ‘ইন্ডিয়া বয়কট’ এবং ‘শহীদ ওসমান হাদির বিচার চাই’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। সমাবেশ শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ‘র্যালি ফর বাংলাদেশ’ মিছিল নিয়ে শাহবাগের শহীদ ওসমান হাদি চত্বরে গিয়ে কর্মসূচি সমাপ্ত হয়।
রিপোর্টারের নাম 























