দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯৯৯ জন শিক্ষক প্রস্তাবিত ‘শিক্ষা আইন ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) এক যৌথ বিবৃতিতে তারা জানিয়েছেন, জনমতের প্রতিফলনহীন এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধবিরোধী কোনো শিক্ষা আইন দেশের ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ জনতা মেনে নেবে না।
বিবৃতিতে শিক্ষকরা বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দায়িত্ব যখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, তখন তড়িঘড়ি করে এমন একটি সুদূরপ্রসারী শিক্ষা আইনের খসড়া প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ। তারা মনে করেন, এই আইনের বিভিন্ন অসংজ্ঞায়িত পরিভাষা ও ধারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির পরিপন্থী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা’ এবং ‘বৈষম্যহীন শিক্ষাক্রম’-এর আড়ালে এমন কিছু বিষয় যুক্ত করার চেষ্টা চলছে, যা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিতর্কিত এজেন্ডার অংশ। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ইউনেস্কোর বিভিন্ন নথিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার নামে জেন্ডার বৈচিত্র্য ও সমকামিতা-বান্ধব (LGBTIQ) শিক্ষাদর্শনের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের অস্পষ্ট ধারা ও ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’ বা ‘সুবিধাবঞ্চিত’ শব্দের মারপ্যাঁচে এই ধরনের বিতর্কিত জীবনবোধ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
বিবৃতিতে শিক্ষকরা স্পষ্টভাবে জানান, রাষ্ট্রকে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিভাবকদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। কোনো শিক্ষার্থীকে তার পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় পড়তে বাধ্য করা যাবে না। এছাড়া, ধর্মীয় বা নৈতিক অবস্থান থেকে কোনো বিষয়ের গঠনমূলক সমালোচনা বা উপদেশ প্রদানকে ‘মানসিক নিগ্রহ’ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রাখা যাবে না বলেও তারা হুঁশিয়ারি দেন।
শিক্ষক সমাজ দাবি করেছেন, এনজিও পরিচালিত বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল ধারায় আনার আগে সেগুলোর সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ‘বিশেষ শিক্ষা’ বলতে কেবল শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকেই বোঝাতে হবে; এর আড়ালে কোনো যৌন পরিচয় বা নৈতিকতাবিরোধী মতাদর্শ প্রচার করা যাবে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা আইন কোনো আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হতে পারে না। বরং এটি হতে হবে দেশের সংবিধান, সামাজিক বাস্তবতা এবং জনগণের বিশ্বাসের প্রতিফলন। দেশীয় বা নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতির নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় চেতনাবিরোধী কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হলে তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হবে।
বিবৃতি প্রদানকারী ৯৯৯ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫২ জন অধ্যাপক, ৩৯ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৭৪ জন সহকারী অধ্যাপক এবং ১৬১ জন প্রভাষকসহ বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনীম ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আবুল হাসনাত।
এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারেক মুহাম্মদ তওফিকুর রহমান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এন এম আসাদুজ্জামান ফকির, বুটেক্সের অধ্যাপক ড. উম্মুল খায়ের ফাতেমা এবং কুয়েট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ও আইইউবি-সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ এই বিবৃতিতে সংহতি প্রকাশ করেছেন।
রিপোর্টারের নাম 





















