চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় শিল্পায়নের নামে অবাধে চলছে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের মহোৎসব। একের পর এক ফসলি জমি, ডোবা, খাল এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ ভরাট করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ও অবৈধ ভূমি ভরাটের কারণে খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এলাকার স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ। এর ফলস্বরূপ সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, যা শত শত বসতবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবকাঠামোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। সম্প্রতি বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের মগপুকুর এলাকায় লোকালয়ের মাঝখানে ‘অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় এক একর আয়তনের একটি জলাশয় ভরাট শুরু করেছে। এলাকাবাসীর দাবি, ভরাটের সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার কারণে কয়েকশ পরিবার চরম উদ্বেগের মধ্যে দিনাতিপাত করছে।
স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা আশপাশের বসতবাড়ির পাশাপাশি স্থানীয় জামে মসজিদ এবং একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সাবেক ইউপি সদস্য আবুল মুনসুর জানান, তাঁর বাড়ির পাশেই দিনরাত জলাশয় ভরাট চলছে। দুই সপ্তাহ আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো প্রতিবাদ করায় কোম্পানির লোকজন তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করছে।
এর আগেও সৈয়দপুর ইউনিয়নে কৃষিজমি ভরাটকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভাড়াটে লোকজন ফসলি জমি ভরাট করতে গেলে কৃষকরা বাধা দেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তর বাঁশবাড়িয়া এলাকায় মহাসড়কের পশ্চিম পাশে কয়েকশ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে ভরাট করা হচ্ছে। একইভাবে এসকেএম জুট মিলসের পশ্চিম পাশে কয়েক একর কৃষিজমি এবং ছোট দারোগাহাট এলাকায় মহাসড়কের পূর্ব পাশেও অবাধে চলছে ফসলি জমি ভরাটের কাজ।
ভূমি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমতি ছাড়া কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং জলাশয় ভরাট সম্পূর্ণ বেআইনি। তাদের মতে, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ও কঠোর অভিযান এখন সময়ের দাবি। তবে সীতাকুণ্ডে এ ধরনের কার্যকর নজরদারি কার্যত অনুপস্থিত।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘অনুমতি ছাড়া কৃষিজমি ভরাট করা যায় না। সরেজমিন প্রমাণ পাওয়া গেলে ভরাট কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম জানান, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখা তাঁর দায়িত্ব। কৃষিজমি ভরাটের বিষয়টি সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পরিবেশ অধিদপ্তর দেখবে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক আবু তাহের দাবি করেন, ডোবা বা জলাশয় ভরাটে অনুমতি লাগে, এটা তাঁর জানা ছিল না এবং প্রয়োজনে অনুমতি নেওয়া হবে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক মুজাহিদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
রিপোর্টারের নাম 























