আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক ও উন্নয়ন দর্শনের রূপরেখা তুলে ধরে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রত্যয়ে ঘোষিত এই ইশতেহারের মূল স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এতে রাষ্ট্র সংস্কার ও জনকল্যাণে ৯টি বিশেষ অগ্রাধিকারসহ মোট ৫১টি দফা বা অঙ্গীকার স্থান পেয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন। আসন্ন নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান এবং এটিই তার পক্ষ থেকে ঘোষিত প্রথম আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি ইশতেহার। ইশতেহারটিকে মোট পাঁচটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দলের কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
৯টি বিশেষ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি:
বিএনপির ঘোষিত ইশতেহারে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে ৯টি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে:
১. ফ্যামিলি কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা: দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ ভবিষ্যতে আরও বাড়ানো হবে।
২. কৃষক কার্ড ও কৃষি বীমা: কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন করা হবে। এর আওতায় ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ সুবিধা দেওয়া হবে। এছাড়া মৎস্যচাষি ও পশুপালনকারীদের জন্য কৃষি বীমা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
৩. স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন: দেশে একটি মানবিক ও দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলা ও মহানগরে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিতের পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
৪. কর্মমুখী শিক্ষা ও মিড-ডে মিল: বাস্তব দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।
৫. তরুণদের কর্মসংস্থান: তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ, কারিগরি ও ভাষা শিক্ষার উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে তরুণদের অংশগ্রহণ সহজ করা হবে।
৬. ক্রীড়া উন্নয়ন: খেলাধুলাকে কেবল বিনোদন নয়, বরং পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।
৭. পরিবেশ ও জলবায়ু: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।
৮. ধর্মীয় সম্প্রীতি: দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক সহাবস্থান সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য বিশেষ সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও পেপাল: আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ (PayPal) চালু করার মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং ও ই-কমার্স খাতকে গতিশীল করা হবে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের পণ্য রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক ই-কমার্স হাবে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।
রাজনৈতিক দর্শন ও প্রেক্ষাপট:
বিএনপি জানিয়েছে, এই ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির দলিল। দলটির দাবি, তারা প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘ভোটের অধিকার’, ‘আইনের শাসন’ এবং ‘দুর্নীতিমুক্ত সমাজ’ গঠনের ওপর।
এই ইশতেহারের মূল ভিত্তি হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ‘৩১ দফা’কে উল্লেখ করা হয়েছে। বিএনপি বলছে, তাদের রাজনীতি স্লোগাননির্ভর নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন পর্যায়ের উপদেষ্টাগণ।
উল্লেখ্য, অতীতে পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে এবারই প্রথম দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান আগামীর বাংলাদেশের জন্য এই বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরলেন।
রিপোর্টারের নাম 
























