আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লক্ষ্য ও পরিকল্পনা স্পষ্ট করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গতকাল সকালে গুলিস্তানে জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়ামে স্থাপিত সেনাক্যাম্প পরিদর্শন এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি সেনাবাহিনীর দুটি প্রধান দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন। সেনাপ্রধান জানান, প্রথমত, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সম্পর্কে আস্থা তৈরি করা এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বিত প্রচেষ্টার বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
বিপুল সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েন মতবিনিময় সভার পর গুলিস্তানে রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে ১ লাখ সেনাসদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন, যা গত নির্বাচনের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলার ৪১১টি উপজেলা এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল ও চেকপোস্টের মাধ্যমে নজরদারি চালাচ্ছে।
দুর্গম এলাকায় লজিস্টিক সহায়তা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নির্বাচনের দিন এবং পরবর্তী সময়ে দুর্গম ও বিপৎসংকুল এলাকার কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনী সরঞ্জাম ও জনবল পরিবহনের জন্য সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা দেশে বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে হেলিকপ্টার মোতায়েন থাকবে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন জানান, এবারই প্রথমবারের মতো সেনাসদস্যদের ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত টহল দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ‘সুরক্ষা অ্যাপ’, ড্রোন এবং পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। ঢাকায় সেনাসদরে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল স্থাপন করা হয়েছে যা পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার অভিযান নির্বাচনী পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে সেনাবাহিনী দেশজুড়ে ব্যাপক অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। গত ১৪ দিনে প্রায় ১৫০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র ও ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। এছাড়া ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের সময় লুট হওয়া অস্ত্রের বড় একটি অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং শেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
অপপ্রচার ও এআই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সংবাদ সম্মেলনে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে ‘অপতথ্য’ বা ‘মিসইনফরমেশন’কে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের মাধ্যমে ভিডিও তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি মূলধারার গণমাধ্যমকে তাৎক্ষণিক বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। সেনাপ্রধানের নির্দেশে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে। সাধারণ মানুষ যাতে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেটিই হবে সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য। কতদিন সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে, তা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
রিপোর্টারের নাম 





















