জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ঢাকার আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যার পর ভ্যানে স্তূপ করে লাশ পোড়ানোর ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আজ ঘোষণা করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই বহুল আলোচিত মামলার রায় প্রদান করবেন।
ট্রাইব্যুনালের এই বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এটি হতে যাচ্ছে তৃতীয় মামলার রায়। তবে ট্রাইব্যুনাল-২-এর জন্য এটিই প্রথম রায়। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাসহ চাঁনখারপুল মামলার রায় ঘোষণা করেছিল।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। পরবর্তীতে গত রোববার রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিনটি ধার্য করা হয়। এই মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় মোট ২৪ জন সাক্ষী তাদের জবানবন্দি দিয়েছেন। বিশেষ করে, এএসআই শেখ আবজালুল হক রাজসাক্ষী হিসেবে শহীদদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি প্রদান করেছেন, যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
মামলার গুরুত্ব তুলে ধরে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লবের সময় আশুলিয়ায় মানবতার ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল। সেখানে ছয়জন তরুণকে কেবল গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ, বরং অত্যন্ত নির্মমভাবে তাদের একজনের জীবন্ত দেহ এবং অন্য পাঁচজনের মৃতদেহ পুলিশের গাড়িতে তুলে খড়ি ও পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে অপরাধীদের পরিচয় এবং অপরাধের ধরন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই মামলায় মোট ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৮ জন কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন—ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলা ডিবির সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই আবদুল মালেক, আরাফাত উদ্দীন, কামরুল হাসান, শেখ আবজালুল হক এবং সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার। মামলার অপর ৮ আসামি, যাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামও রয়েছেন, বর্তমানে পলাতক।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২ জুলাই এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়। অভিযোগের সপক্ষে ৩১৩ পৃষ্ঠার তথ্যসূত্র, ৬২ জন সাক্ষী, ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণ এবং দুটি পেনড্রাইভ সংযুক্ত করা হয়। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং ১৪ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে আশুলিয়া থানার সামনে পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং একজন গুরুতর আহত হন। সেই মুমূর্ষু ব্যক্তি ও মৃতদেহগুলো প্রথমে একটি ভ্যানে স্তূপ করা হয় এবং পরে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে তুলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ভয়াবহ ঘটনায় সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন এবং অজ্ঞাতনামা আরও একজন শহীদ হন। এই নৃশংসতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
রিপোর্টারের নাম 

























