ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আয়নাঘরে আটকাবস্থায় ব্রিগেডিয়ার আজমীর চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি: ‘সেনাবাহিনীই শিখিয়েছে ভারত প্রধান শত্রু’

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:২৮:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চলমান এক মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী। সোমবার দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ আট বছর ধরে ডিজিএফআইয়ের ‘আয়নাঘর’ নামক বন্দিশালায় আটক থাকাকালীন জিজ্ঞাসাবাদে তাকে বারবার ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করার কারণ জানতে চাওয়া হয়। এর উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তার ৩০ বছরের চাকরি জীবনে তাকে শেখানো হয়েছে যে, ভারতই বাংলাদেশের প্রধান শত্রু। তার এই বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে, যেসব সেনাপ্রধান ও মেজর জেনারেল ৩০ বছর ধরে এই শিক্ষা দিয়েছেন, তারাও সমান অপরাধী বলে মন্তব্য করেন আযমী।

মগবাজারের বাসা থেকে ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন আযমী। এরপর থেকে দীর্ঘ আট বছর তিনি ‘আয়নাঘর’ নামের বন্দিশালায় গুম করে রাখা হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি দেন। এর আগে রোববার প্রথম দিনের জবানবন্দি প্রদান করেন তিনি।

আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ভারতের বিরুদ্ধে লেখা যদি দণ্ডনীয় অপরাধ হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দিয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে না কেন? কেন তাকে অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছে?

নিজের বন্দিদশার বর্ণনা দিতে গিয়ে আযমী বলেন, আয়নাঘরের তোশকে শত শত ছারপোকা ছিল, যার কামড়ে তার কাপড়-চোপড় রক্তে রঞ্জিত হয়ে যেত। রক্তমাখা কাপড় নিয়ে নামাজ পড়ার সমস্যার কারণে পৃথক লুঙ্গি চাইলে তা দেওয়া হয়নি। আগে যে নিম্নমানের লুঙ্গি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিঁড়ে গিয়েছিল। ছিঁড়ে যাওয়া স্থানে সেলাই করার জন্য সুতা চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া জায়গায় গিট দিয়ে তাকে ব্যবহার করতে হয়েছে।

জবানবন্দিতে আযমী আরও বলেন, অপহরণের এক মাস পর ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫০ মিনিটে একজন কর্মকর্তা তাকে জানান, একটি অঘটন ঘটার আশঙ্কায় তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং সেই আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় এখন তার মুক্তির সময় এসেছে। মুক্তির দিনক্ষণ জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, তার মুক্তির বিষয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসবে, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

২০২২ সালের এক জিজ্ঞাসাবাদের কথা উল্লেখ করে আযমী বলেন, সে সময় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে তার আলাপচারিতা ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা করা হয় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে কি না। তিনি জিজ্ঞাসাবাদকারীদের বলেন, সেনাবাহিনী থেকে তাকে বরখাস্ত করার সাত বছর দুই মাস পর অপহরণ করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময় গোয়েন্দা বাহিনী তার পেছনে ঘুরেছে, জামায়াতের সঙ্গে তার ন্যূনতম সম্পর্ক থাকার কোনো রিপোর্ট তাদের কাছে আছে কি না। তিনি আরও প্রশ্ন করেন, জামায়াতে কি উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ নেতা হয়? রাজনীতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা যেন জামায়াতের এমন কোনো উদাহরণ দেখান যেখানে কোনো নেতা উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্ব পেয়েছেন। এরপরও তাকে জামায়াতের আমির হতে যাচ্ছেন বলে স্বীকার করার জন্য পীড়াপীড়ি করা হয়।

আযমী বলেন, তার বাবা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমির হলেও, সেই দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। যেহেতু সম্পর্ক নেই, সেহেতু দলের আমির হওয়ার প্রশ্নটি হাস্যকর। এরপরও ভারতের বিরুদ্ধে তার লেখালেখি নিয়ে তারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন করে। একপর্যায়ে তিনি জানতে চান, তারা কি তাকে মেরে ফেলবেন? জবাবে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, মেরে ফেলতে চাইলে আরও আগেই মেরে ফেলতে পারতেন।

জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন। জেরার জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আগামী ৫ দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই, বাড়তে পারে তাপমাত্রা

আয়নাঘরে আটকাবস্থায় ব্রিগেডিয়ার আজমীর চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি: ‘সেনাবাহিনীই শিখিয়েছে ভারত প্রধান শত্রু’

আপডেট সময় : ১০:২৮:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চলমান এক মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী। সোমবার দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ আট বছর ধরে ডিজিএফআইয়ের ‘আয়নাঘর’ নামক বন্দিশালায় আটক থাকাকালীন জিজ্ঞাসাবাদে তাকে বারবার ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করার কারণ জানতে চাওয়া হয়। এর উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তার ৩০ বছরের চাকরি জীবনে তাকে শেখানো হয়েছে যে, ভারতই বাংলাদেশের প্রধান শত্রু। তার এই বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে, যেসব সেনাপ্রধান ও মেজর জেনারেল ৩০ বছর ধরে এই শিক্ষা দিয়েছেন, তারাও সমান অপরাধী বলে মন্তব্য করেন আযমী।

মগবাজারের বাসা থেকে ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন আযমী। এরপর থেকে দীর্ঘ আট বছর তিনি ‘আয়নাঘর’ নামের বন্দিশালায় গুম করে রাখা হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি দেন। এর আগে রোববার প্রথম দিনের জবানবন্দি প্রদান করেন তিনি।

আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ভারতের বিরুদ্ধে লেখা যদি দণ্ডনীয় অপরাধ হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দিয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে না কেন? কেন তাকে অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছে?

নিজের বন্দিদশার বর্ণনা দিতে গিয়ে আযমী বলেন, আয়নাঘরের তোশকে শত শত ছারপোকা ছিল, যার কামড়ে তার কাপড়-চোপড় রক্তে রঞ্জিত হয়ে যেত। রক্তমাখা কাপড় নিয়ে নামাজ পড়ার সমস্যার কারণে পৃথক লুঙ্গি চাইলে তা দেওয়া হয়নি। আগে যে নিম্নমানের লুঙ্গি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিঁড়ে গিয়েছিল। ছিঁড়ে যাওয়া স্থানে সেলাই করার জন্য সুতা চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া জায়গায় গিট দিয়ে তাকে ব্যবহার করতে হয়েছে।

জবানবন্দিতে আযমী আরও বলেন, অপহরণের এক মাস পর ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫০ মিনিটে একজন কর্মকর্তা তাকে জানান, একটি অঘটন ঘটার আশঙ্কায় তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং সেই আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় এখন তার মুক্তির সময় এসেছে। মুক্তির দিনক্ষণ জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, তার মুক্তির বিষয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসবে, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

২০২২ সালের এক জিজ্ঞাসাবাদের কথা উল্লেখ করে আযমী বলেন, সে সময় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে তার আলাপচারিতা ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা করা হয় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে কি না। তিনি জিজ্ঞাসাবাদকারীদের বলেন, সেনাবাহিনী থেকে তাকে বরখাস্ত করার সাত বছর দুই মাস পর অপহরণ করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময় গোয়েন্দা বাহিনী তার পেছনে ঘুরেছে, জামায়াতের সঙ্গে তার ন্যূনতম সম্পর্ক থাকার কোনো রিপোর্ট তাদের কাছে আছে কি না। তিনি আরও প্রশ্ন করেন, জামায়াতে কি উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ নেতা হয়? রাজনীতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা যেন জামায়াতের এমন কোনো উদাহরণ দেখান যেখানে কোনো নেতা উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্ব পেয়েছেন। এরপরও তাকে জামায়াতের আমির হতে যাচ্ছেন বলে স্বীকার করার জন্য পীড়াপীড়ি করা হয়।

আযমী বলেন, তার বাবা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমির হলেও, সেই দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। যেহেতু সম্পর্ক নেই, সেহেতু দলের আমির হওয়ার প্রশ্নটি হাস্যকর। এরপরও ভারতের বিরুদ্ধে তার লেখালেখি নিয়ে তারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন করে। একপর্যায়ে তিনি জানতে চান, তারা কি তাকে মেরে ফেলবেন? জবাবে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, মেরে ফেলতে চাইলে আরও আগেই মেরে ফেলতে পারতেন।

জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন। জেরার জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১।