ঢাকা ০৬:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সাইবার হামলার শঙ্কা তুঙ্গে, প্রস্তুতিতে গলদ?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশে সাইবার হামলার ঝুঁকি ততই প্রকট হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, নির্বাচনের আগে ও ভোটের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার, নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সরকারি ওয়েবসাইট, রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সমন্বিত সাইবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। বিশ্বের সাম্প্রতিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সাইবার হামলা এখন নির্বাচনি প্রক্রিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা জনমত প্রভাবিত করা থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটের আগে ডি-ডস (DDoS) আক্রমণ, ভোটার ডেটা হ্যাকিং, সমন্বিত গুজব, বট নেটওয়ার্কের ব্যবহার এবং ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করার ঘটনা বিশ্বজুড়ে এখন নিয়মিত কৌশল। ডি-ডস আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য কোনো সিস্টেম ধ্বংস করা নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সেটিকে অকার্যকর করে দেওয়া। বিপুল সংখ্যক ভুয়া অনুরোধের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট, ফলাফল প্রকাশের সার্ভার বা সরকারি তথ্য পোর্টাল অচল করে দিয়ে তথ্যশূন্যতা তৈরি করা হয়, যা গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর পথ খুলে দেয়। এটি কেবল প্রযুক্তিগত আক্রমণ নয়, নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত।

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় সাইবার হামলার একাধিক উদাহরণ দেখা গেছে। যেমন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মলদোভার নির্বাচনকালে দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন, সরকারি ক্লাউড সিস্টেম এবং প্রবাসী ভোটার-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটগুলো ব্যাপক সাইবার আক্রমণের শিকার হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এই হামলাকে ‘ব্যাপক সাইবার আক্রমণের অংশ’ হিসেবে আখ্যা দেন। একইভাবে, ২০২৪ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময় নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইট এবং সরকারি সাইটগুলোতে ডি-ডস আক্রমণ চালানো হয়, যার দায় স্বীকার করে একটি প্রো-ক্রিমিনাল হ্যাকার গ্রুপ। পর্যবেক্ষকরা এই হামলাগুলোকে নির্বাচনি তথ্য পরিবেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও সাইবার হামলার ঝুঁকি অত্যন্ত বাস্তব। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে নির্বাচন কমিশনের ভোটার ডেটাবেস, ফলাফল সংগ্রহ ও প্রকাশের ডিজিটাল সিস্টেম, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যভাণ্ডার এবং গণমাধ্যমের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত গুজব, ভুয়া পোস্ট ও কৃত্রিম ভিডিও (ডিপফেক) এখন সবচেয়ে বড় হুমকি।

সম্প্রতি একটি শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের আগে একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া বুঝিয়ে দেয়, সাইবার ঝুঁকি তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব ও তাৎক্ষণিক। বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভুয়া বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর ঘোষণা বা উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো গেলে অল্প সময়েই রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব, যা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। এই ঘটনা আরও দেখায় যে, ডিজিটাল আক্রমণের লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক শীর্ষ নেতারাই নন—সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট, আইনজীবী ও সাধারণ ব্যবহারকারীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ার এই সময়ে এসব ঘটনাকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে একাধিক সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়া, গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সেবায় বিঘ্ন এবং সামাজিক মাধ্যমে সংগঠিত ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নির্বাচনের সময় এসব আক্রমণ আরও সংগঠিত ও সমন্বিত হতে পারে। একাধিক রাজনৈতিক দলের পেজ বা অ্যাকাউন্ট একসঙ্গে আক্রান্ত হলে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে পরিকল্পিত সাইবার হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের সময় সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক স্তরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিস্টেমগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহজনক সাইবার কার্যক্রম নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের আইটি শাখা ভোটার তালিকা ও সার্ভারগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা বলেছে। এছাড়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিটগুলোও অনলাইন অপরাধ ও গুজব নজরদারিতে রাখবে।

তবে স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষিত প্রস্তুতি এবং বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে এখনো যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। তাদের ভাষায়, সাইবার হামলা কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেরও অংশ। ডেটা সুরক্ষা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ—এই তিন জায়গায় সামান্য ঘাটতিও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ডিপ-ফেক ও বটচালিত ক্যাম্পেইন ঠেকাতে কার্যকর গাইডলাইনের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতাকেও তারা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনে ব্যবহৃত কিছু ইমেইলে ফিশিং লিংক পাঠানো হচ্ছে, যা প্রশ্ন তুলেছে এসব ইমেইল ঠিকানা কীভাবে হ্যাকারদের হাতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, তথ্য ফাঁস বা অননুমোদিত অ্যাক্সেসের চেষ্টা চলছে। এ পরিস্থিতিতে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের সোশ্যাল মিডিয়া পরিচালকদের বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এ প্রসঙ্গে বলেন, “সাইবার হামলার ঝুঁকি এখন বাস্তব হুমকি। সরকার ও বিজিডি ই-গভ সিআইআরটি সতর্কতা জারি করেছে এবং প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।” উল্লেখ্য, বিজিডি ই-গভ সিআইআরটি হলো বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় পর্যায়ের সাইবার নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়া সংস্থা, যা রাষ্ট্রের ডিজিটাল অবকাঠামোর ‘সাইবার ফায়ার সার্ভিস’ হিসেবে কাজ করে। সাইবার হামলা হলে এ সংস্থাই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

ওয়ান ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট কেএম মহিউদ্দিন উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশ ক্রমেই সাইবার হামলার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও সরকারি খাতে। দেশি-বিদেশি অপরাধী গোষ্ঠী এআই, র‌্যানসমওয়্যার-এজ-এ-সার্ভিসের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবলের অভাব ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া কাঠামোর ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এসব মোকাবিলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং প্রোঅ্যাক্টিভ, ডিটেকটিভ ও রিঅ্যাকটিভ প্রতিরক্ষা কৌশল জোরদার করা জরুরি।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন এখন আর শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচন হয় টাইম লাইনে, ট্রেন্ডে, স্ক্রিনে। আজ একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হচ্ছে, কাল যে কোনো দলের বা যে কোনো ব্যক্তির হতে পারে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে ঝুঁকিতে থাকবে সবাই। বেসরকারি থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান সাইবার ক্যানিয়নের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন এ ব্যাপারে বলেন, “যেভাবে সাইবার হামলার ধরন প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে, সেভাবে কিন্তু সরকারের সাইবার নিরাপত্তার প্রস্তুতি নেই। আবার সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নীতিমালা কিছু থাকলেও সেটা বাস্তবায়নেরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। সরকারের উদাসীনতা, ব্যবহারকারীর অসচেতনতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোনোরকম দায়সারা মনোভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর বিদেশযাত্রা ও প্রত্যাবর্তন: বিমানবন্দরে থাকবেন চার শীর্ষ কর্মকর্তা

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সাইবার হামলার শঙ্কা তুঙ্গে, প্রস্তুতিতে গলদ?

আপডেট সময় : ১০:১৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশে সাইবার হামলার ঝুঁকি ততই প্রকট হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, নির্বাচনের আগে ও ভোটের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার, নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সরকারি ওয়েবসাইট, রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সমন্বিত সাইবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। বিশ্বের সাম্প্রতিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সাইবার হামলা এখন নির্বাচনি প্রক্রিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা জনমত প্রভাবিত করা থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটের আগে ডি-ডস (DDoS) আক্রমণ, ভোটার ডেটা হ্যাকিং, সমন্বিত গুজব, বট নেটওয়ার্কের ব্যবহার এবং ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করার ঘটনা বিশ্বজুড়ে এখন নিয়মিত কৌশল। ডি-ডস আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য কোনো সিস্টেম ধ্বংস করা নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সেটিকে অকার্যকর করে দেওয়া। বিপুল সংখ্যক ভুয়া অনুরোধের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট, ফলাফল প্রকাশের সার্ভার বা সরকারি তথ্য পোর্টাল অচল করে দিয়ে তথ্যশূন্যতা তৈরি করা হয়, যা গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর পথ খুলে দেয়। এটি কেবল প্রযুক্তিগত আক্রমণ নয়, নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত।

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় সাইবার হামলার একাধিক উদাহরণ দেখা গেছে। যেমন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মলদোভার নির্বাচনকালে দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন, সরকারি ক্লাউড সিস্টেম এবং প্রবাসী ভোটার-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটগুলো ব্যাপক সাইবার আক্রমণের শিকার হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এই হামলাকে ‘ব্যাপক সাইবার আক্রমণের অংশ’ হিসেবে আখ্যা দেন। একইভাবে, ২০২৪ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময় নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইট এবং সরকারি সাইটগুলোতে ডি-ডস আক্রমণ চালানো হয়, যার দায় স্বীকার করে একটি প্রো-ক্রিমিনাল হ্যাকার গ্রুপ। পর্যবেক্ষকরা এই হামলাগুলোকে নির্বাচনি তথ্য পরিবেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও সাইবার হামলার ঝুঁকি অত্যন্ত বাস্তব। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে নির্বাচন কমিশনের ভোটার ডেটাবেস, ফলাফল সংগ্রহ ও প্রকাশের ডিজিটাল সিস্টেম, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যভাণ্ডার এবং গণমাধ্যমের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত গুজব, ভুয়া পোস্ট ও কৃত্রিম ভিডিও (ডিপফেক) এখন সবচেয়ে বড় হুমকি।

সম্প্রতি একটি শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের আগে একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া বুঝিয়ে দেয়, সাইবার ঝুঁকি তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব ও তাৎক্ষণিক। বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভুয়া বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর ঘোষণা বা উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো গেলে অল্প সময়েই রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব, যা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। এই ঘটনা আরও দেখায় যে, ডিজিটাল আক্রমণের লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক শীর্ষ নেতারাই নন—সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট, আইনজীবী ও সাধারণ ব্যবহারকারীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ার এই সময়ে এসব ঘটনাকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে একাধিক সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়া, গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সেবায় বিঘ্ন এবং সামাজিক মাধ্যমে সংগঠিত ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নির্বাচনের সময় এসব আক্রমণ আরও সংগঠিত ও সমন্বিত হতে পারে। একাধিক রাজনৈতিক দলের পেজ বা অ্যাকাউন্ট একসঙ্গে আক্রান্ত হলে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে পরিকল্পিত সাইবার হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের সময় সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক স্তরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিস্টেমগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহজনক সাইবার কার্যক্রম নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের আইটি শাখা ভোটার তালিকা ও সার্ভারগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা বলেছে। এছাড়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিটগুলোও অনলাইন অপরাধ ও গুজব নজরদারিতে রাখবে।

তবে স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষিত প্রস্তুতি এবং বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে এখনো যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। তাদের ভাষায়, সাইবার হামলা কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেরও অংশ। ডেটা সুরক্ষা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ—এই তিন জায়গায় সামান্য ঘাটতিও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ডিপ-ফেক ও বটচালিত ক্যাম্পেইন ঠেকাতে কার্যকর গাইডলাইনের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতাকেও তারা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনে ব্যবহৃত কিছু ইমেইলে ফিশিং লিংক পাঠানো হচ্ছে, যা প্রশ্ন তুলেছে এসব ইমেইল ঠিকানা কীভাবে হ্যাকারদের হাতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, তথ্য ফাঁস বা অননুমোদিত অ্যাক্সেসের চেষ্টা চলছে। এ পরিস্থিতিতে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের সোশ্যাল মিডিয়া পরিচালকদের বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এ প্রসঙ্গে বলেন, “সাইবার হামলার ঝুঁকি এখন বাস্তব হুমকি। সরকার ও বিজিডি ই-গভ সিআইআরটি সতর্কতা জারি করেছে এবং প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।” উল্লেখ্য, বিজিডি ই-গভ সিআইআরটি হলো বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় পর্যায়ের সাইবার নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়া সংস্থা, যা রাষ্ট্রের ডিজিটাল অবকাঠামোর ‘সাইবার ফায়ার সার্ভিস’ হিসেবে কাজ করে। সাইবার হামলা হলে এ সংস্থাই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

ওয়ান ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট কেএম মহিউদ্দিন উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশ ক্রমেই সাইবার হামলার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও সরকারি খাতে। দেশি-বিদেশি অপরাধী গোষ্ঠী এআই, র‌্যানসমওয়্যার-এজ-এ-সার্ভিসের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবলের অভাব ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া কাঠামোর ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এসব মোকাবিলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং প্রোঅ্যাক্টিভ, ডিটেকটিভ ও রিঅ্যাকটিভ প্রতিরক্ষা কৌশল জোরদার করা জরুরি।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন এখন আর শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচন হয় টাইম লাইনে, ট্রেন্ডে, স্ক্রিনে। আজ একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হচ্ছে, কাল যে কোনো দলের বা যে কোনো ব্যক্তির হতে পারে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে ঝুঁকিতে থাকবে সবাই। বেসরকারি থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান সাইবার ক্যানিয়নের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন এ ব্যাপারে বলেন, “যেভাবে সাইবার হামলার ধরন প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে, সেভাবে কিন্তু সরকারের সাইবার নিরাপত্তার প্রস্তুতি নেই। আবার সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নীতিমালা কিছু থাকলেও সেটা বাস্তবায়নেরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। সরকারের উদাসীনতা, ব্যবহারকারীর অসচেতনতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোনোরকম দায়সারা মনোভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল।”