ঢাকা ০২:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গুমের পর ডিজিএফআই কমপ্লেক্সে আটক ও নির্যাতন: জবানবন্দিতে আমান আযমী, চিনেছি কর্মকর্তাকেও

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৫:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এক চাঞ্চল্যকর জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেছেন, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট তাকে অপহরণের সময় যমটুপি পরানোর পরেও তিনি একজন ডিজিএফআই কর্মকর্তা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মকছুরুলকে চিনতে পেরেছিলেন। এরপর তাকে প্রায় আট বছর ডিজিএফআইয়ের কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

গতকাল রোববার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়, যেখানে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তা অভিযুক্ত, তার বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে আমান আযমী এই জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে আমান আযমী জানান, তিনি ১৯৮১ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ২০০৯ সালের ২৪ জুন আওয়ামী লীগ সরকার বিনা অপরাধে, বিনা তদন্তে ও বিনা বিচারে সেনাবাহিনীর সব রীতিনীতি ভঙ্গ করে তাকে পেনশন সুবিধা হরণ করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। এরপর সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। অপহরণের আগ পর্যন্ত সাত বছর দুই মাস তাকে গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার অবৈধ বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে তাকে অবসরে পাঠায়।

আমান আযমী বলেন, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে মগবাজারের বড় বাসায় ৫০-৬০ জন সাধারণ পোশাকধারী ব্যক্তি অনেকগুলো মাইক্রোবাসে করে আসে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। তারা তাকে হাতকড়া পরানোর জন্য হাত এগিয়ে দিতে বললে তিনি নিরুপায় হয়ে তা করেন। প্রথমে হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর লিফটে করে নিচে নামিয়ে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে মাথা ও মুখের ওপর যমটুপি পরিয়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর তারা তাকে নিয়ে রওনা হয়।

তিনি জানান, যমটুপি পরানোর পর চোখের বাঁধন খানিকটা নিচে নেমে যাওয়ায় তিনি আবছা দেখতে পান। এতে কোন রাস্তা দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তা তিনি বুঝতে পারেন। মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে মহাখালী ব্রিজের নিচ দিয়ে এয়ারপোর্টের পূর্বদিকের রাস্তা ধরে র‍্যাব-১-এর দক্ষিণ গেট দিয়ে ঢুকে তারা উত্তর দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর মূল রাস্তা পার হয়ে পশ্চিম দিকে র‍্যাব সদর দপ্তরের সামনে দিয়ে এয়ারপোর্টের পূর্বদিক হয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের সামনে দিয়ে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করে। সবশেষে তারা কচুক্ষেতে অবস্থিত ডিজিএফআই কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে ধরে ধরে একটি সেলের ভেতরে ঢুকিয়ে যমটুপি, চোখের বাঁধন ও হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়।

আমান আযমী আরও বলেন, পরদিন ২৩ আগস্ট ভোরের আলো হলে সেলের দক্ষিণ দিকে দুটি ভেন্টিলেটর দিয়ে তিনি ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের দক্ষিণে অবস্থিত ঢাকা স্টেশন অফিসার্স মেস-বি চিনতে পারেন। ১৯৮২ সালে নির্মিত এই মেসটি যখন তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চাকরিরত ছিলেন, তখন এর প্রথম বাসিন্দাদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। ১৯৮২-৮৩ সালে তিনি ওই মেসে থেকেছেন। তখন থেকেই তিনি জানতেন, মেসের উত্তর দিকে ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত ভবনটি জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি)। তাই তিনি বুঝতে পারেন তাকে জেআইসিতে আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত তাকে ওই সেলেই রাখা হয়েছিল। মাঝে দুবার কয়েক দিনের জন্য অন্য সেলে নিলেও পরে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। এই সেলটি ১১ নম্বর সেল হিসেবে চিহ্নিত এবং চাবির রিংয়ে তিনি ১১ ও ভিআইপি লেখা দেখতে পেয়েছিলেন।

তিনি জানান, তিনি যে ডিজিএফআইয়ের কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের জেআইসিতে ছিলেন, তা তিনি আরও কয়েকটি উপায়ে নিশ্চিত হয়েছিলেন। প্রথমত, তিনি নিয়মিত তার সেল থেকে দুটি আজান শুনতে পেতেন—একটি ছিল বিএনএস হাজী মুহসীন থেকে, আরেকটি মেসের দক্ষিণে অবস্থিত অফিসারদের বাসভবন এলাকার মসজিদ থেকে। অন্যান্য আলামতের মধ্যে ছিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান উড্ডয়নের সময় কচুক্ষেতের ওপর দিয়ে যাওয়ার শব্দ, কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের পশ্চিম দিকে অবস্থিত হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের আওয়াজ, স্টেশন মেস-বিতে সেনাবাহিনীর প্রথা অনুযায়ী বিভিন্ন পার্টিতে বাজানো ব্যান্ডের আওয়াজ।

আমান আযমী আরও বলেন, ১৯৮২-৮৩ সালে মেস-বিতে থাকাকালীন পূর্বদিকে বনানী এমপি চেকপোস্টের পাশ দিয়ে নিয়মিত যে ট্রেন চলাচলের আওয়াজ পেতেন, সেলে থাকাকালীন সময়েও ঠিক একই দিক থেকে তিনি নিয়মিত সে আওয়াজ পেতেন। এছাড়াও সেলে যারা ডিউটি করতে আসতো, এমওডিসির (মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স কনস্ট্যাবুলারি) সিপাহি, তাদের মধ্যে থেকেও কয়েকজন নিশ্চিত করেছে যে তাকে কচুক্ষেতে অবস্থিত ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের ভেতরে জেআইসিতে রাখা হয়েছে।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আটক থাকাকালীন খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য বিষয়ে তিনি সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেলে কোনো প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ছিল না। দীর্ঘ দুই হাজার ৯০৮ দিন তিনি আকাশ, চাঁদ-সূর্য, মেঘ-বৃষ্টি, গাছ বা মাটির দেখা পাননি। দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

এছাড়াও সেলের চারদিকে ২৪ ঘণ্টা নানারকমের আওয়াজ হতো, যার ফলে তার সার্বক্ষণিক মাথাব্যথা থাকত। যখন মসজিদে আজান দিত অথবা মসজিদ থেকে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু বা অন্য কোনো বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হতো, তখন নানারকম মেশিন দিয়ে আরও আওয়াজ করা হতো। তিনি জানতে পেরেছেন এই আওয়াজ করার উদ্দেশ্য ছিল বাইরে থেকে কোনো শব্দ যেন ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, কিংবা সেলে কাউকে নির্যাতন করা হলে তার আর্তনাদের আওয়াজ যেন বাইরে না যায়।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, সেখানকার খাবার অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। এজন্য ছয় বছর চার মাস পর্যন্ত তিনি কখনো তিন বেলা খাবার খেতে পারেননি। ডিজিএফআইয়ের ডাক্তারের অব্যাহত চাপের ফলে ২০২৩ সালের শুরু থেকে তিনি তিন বেলা খাবার শুরু করেন। এই দীর্ঘ আট বছর কোনোদিন তৃপ্তি করে পেট ভরে খেতে পারেননি। কখনো এক বেলা খেয়েছেন, কখনো দুই বেলা। খাবার এত নিম্নমানের ছিল যে কখনো কখনো সামান্য ভাত খেয়েই থেকেছেন।

চিকিৎসা সেখানে অত্যন্ত অপ্রতুল ছিল। চোখ, কান, দাঁতের সমস্যাসহ চর্মরোগ ও পেটের পীড়ায় সম্পূর্ণ সময় তাকে ভুগতে হয়েছে। তিনি মোট চারবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তার একিউট কিডনি ইনফেকশন হয়, করোনা হয় ও দুটো দাঁত ভেঙে যায়। তাকে যে টয়লেট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল তা তার সেল থেকে আনুমানিক ৪০-৪৫ কদম দূরে ছিল। টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তারা তাকে হাতকড়া পরাত, চোখ বাঁধতো এবং যমটুপি পরিয়ে নিয়ে যেত। কোনো কোনো সময় চোখ এত জোরে বাঁধতো যে তার চোখের মণিতে প্রচণ্ড ব্যথা করত এবং নাকে এত চাপ লাগত যে শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হতো।

তিনি আরও বলেন, উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় তিনি নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েন। একসময় শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাতেন। কখনো কখনো অবস্থা এত খারাপ হতো যে তাকে একজন বা কখনো দুজন ধরে বিছানা থেকে উঠানো হতো। খাবার সময় তার চেয়ারের পাশে একজন দাঁড়িয়ে থাকত যেন দুর্বলতার কারণে তিনি মাটিতে পড়ে না যান। সেলটি গরমের সময় অত্যন্ত গরম এবং শীতের সময় প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকত। গরমের সময় অতিরিক্ত ঘামানোর ফলে ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স হতো। লবণের ঘাটতি পূরণের জন্য কখনো কখনো তাকে তিন বেলা খাবারের সঙ্গে তিনটা করে লবণের ট্যাবলেট (সোডিক্লোর) খাওনো হতো। ডাক্তার খাবারের সময় কাঁচা লবণও খেতে বলেছিল। সোডিয়াম ঘাটতির জন্য প্রথম ১৩ মাসে রমজান মাস ছাড়া প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচদিন স্যালাইন লাগানো হতো। চোখ বেঁধে রাখার ফলে দুচোখের দুই ধারে এবং গালে ঘা হয়ে গিয়েছিল।

আদালত তার জবানবন্দি শেষ না হওয়ায় অবশিষ্ট অংশের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আগামী ৫ দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই, বাড়তে পারে তাপমাত্রা

গুমের পর ডিজিএফআই কমপ্লেক্সে আটক ও নির্যাতন: জবানবন্দিতে আমান আযমী, চিনেছি কর্মকর্তাকেও

আপডেট সময় : ০৯:৫৫:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এক চাঞ্চল্যকর জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেছেন, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট তাকে অপহরণের সময় যমটুপি পরানোর পরেও তিনি একজন ডিজিএফআই কর্মকর্তা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মকছুরুলকে চিনতে পেরেছিলেন। এরপর তাকে প্রায় আট বছর ডিজিএফআইয়ের কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

গতকাল রোববার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়, যেখানে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তা অভিযুক্ত, তার বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে আমান আযমী এই জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে আমান আযমী জানান, তিনি ১৯৮১ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ২০০৯ সালের ২৪ জুন আওয়ামী লীগ সরকার বিনা অপরাধে, বিনা তদন্তে ও বিনা বিচারে সেনাবাহিনীর সব রীতিনীতি ভঙ্গ করে তাকে পেনশন সুবিধা হরণ করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। এরপর সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। অপহরণের আগ পর্যন্ত সাত বছর দুই মাস তাকে গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার অবৈধ বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে তাকে অবসরে পাঠায়।

আমান আযমী বলেন, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে মগবাজারের বড় বাসায় ৫০-৬০ জন সাধারণ পোশাকধারী ব্যক্তি অনেকগুলো মাইক্রোবাসে করে আসে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। তারা তাকে হাতকড়া পরানোর জন্য হাত এগিয়ে দিতে বললে তিনি নিরুপায় হয়ে তা করেন। প্রথমে হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর লিফটে করে নিচে নামিয়ে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে মাথা ও মুখের ওপর যমটুপি পরিয়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর তারা তাকে নিয়ে রওনা হয়।

তিনি জানান, যমটুপি পরানোর পর চোখের বাঁধন খানিকটা নিচে নেমে যাওয়ায় তিনি আবছা দেখতে পান। এতে কোন রাস্তা দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তা তিনি বুঝতে পারেন। মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে মহাখালী ব্রিজের নিচ দিয়ে এয়ারপোর্টের পূর্বদিকের রাস্তা ধরে র‍্যাব-১-এর দক্ষিণ গেট দিয়ে ঢুকে তারা উত্তর দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর মূল রাস্তা পার হয়ে পশ্চিম দিকে র‍্যাব সদর দপ্তরের সামনে দিয়ে এয়ারপোর্টের পূর্বদিক হয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের সামনে দিয়ে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করে। সবশেষে তারা কচুক্ষেতে অবস্থিত ডিজিএফআই কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে ধরে ধরে একটি সেলের ভেতরে ঢুকিয়ে যমটুপি, চোখের বাঁধন ও হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়।

আমান আযমী আরও বলেন, পরদিন ২৩ আগস্ট ভোরের আলো হলে সেলের দক্ষিণ দিকে দুটি ভেন্টিলেটর দিয়ে তিনি ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের দক্ষিণে অবস্থিত ঢাকা স্টেশন অফিসার্স মেস-বি চিনতে পারেন। ১৯৮২ সালে নির্মিত এই মেসটি যখন তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চাকরিরত ছিলেন, তখন এর প্রথম বাসিন্দাদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। ১৯৮২-৮৩ সালে তিনি ওই মেসে থেকেছেন। তখন থেকেই তিনি জানতেন, মেসের উত্তর দিকে ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত ভবনটি জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি)। তাই তিনি বুঝতে পারেন তাকে জেআইসিতে আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত তাকে ওই সেলেই রাখা হয়েছিল। মাঝে দুবার কয়েক দিনের জন্য অন্য সেলে নিলেও পরে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। এই সেলটি ১১ নম্বর সেল হিসেবে চিহ্নিত এবং চাবির রিংয়ে তিনি ১১ ও ভিআইপি লেখা দেখতে পেয়েছিলেন।

তিনি জানান, তিনি যে ডিজিএফআইয়ের কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের জেআইসিতে ছিলেন, তা তিনি আরও কয়েকটি উপায়ে নিশ্চিত হয়েছিলেন। প্রথমত, তিনি নিয়মিত তার সেল থেকে দুটি আজান শুনতে পেতেন—একটি ছিল বিএনএস হাজী মুহসীন থেকে, আরেকটি মেসের দক্ষিণে অবস্থিত অফিসারদের বাসভবন এলাকার মসজিদ থেকে। অন্যান্য আলামতের মধ্যে ছিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান উড্ডয়নের সময় কচুক্ষেতের ওপর দিয়ে যাওয়ার শব্দ, কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের পশ্চিম দিকে অবস্থিত হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের আওয়াজ, স্টেশন মেস-বিতে সেনাবাহিনীর প্রথা অনুযায়ী বিভিন্ন পার্টিতে বাজানো ব্যান্ডের আওয়াজ।

আমান আযমী আরও বলেন, ১৯৮২-৮৩ সালে মেস-বিতে থাকাকালীন পূর্বদিকে বনানী এমপি চেকপোস্টের পাশ দিয়ে নিয়মিত যে ট্রেন চলাচলের আওয়াজ পেতেন, সেলে থাকাকালীন সময়েও ঠিক একই দিক থেকে তিনি নিয়মিত সে আওয়াজ পেতেন। এছাড়াও সেলে যারা ডিউটি করতে আসতো, এমওডিসির (মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স কনস্ট্যাবুলারি) সিপাহি, তাদের মধ্যে থেকেও কয়েকজন নিশ্চিত করেছে যে তাকে কচুক্ষেতে অবস্থিত ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের ভেতরে জেআইসিতে রাখা হয়েছে।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আটক থাকাকালীন খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য বিষয়ে তিনি সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেলে কোনো প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ছিল না। দীর্ঘ দুই হাজার ৯০৮ দিন তিনি আকাশ, চাঁদ-সূর্য, মেঘ-বৃষ্টি, গাছ বা মাটির দেখা পাননি। দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

এছাড়াও সেলের চারদিকে ২৪ ঘণ্টা নানারকমের আওয়াজ হতো, যার ফলে তার সার্বক্ষণিক মাথাব্যথা থাকত। যখন মসজিদে আজান দিত অথবা মসজিদ থেকে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু বা অন্য কোনো বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হতো, তখন নানারকম মেশিন দিয়ে আরও আওয়াজ করা হতো। তিনি জানতে পেরেছেন এই আওয়াজ করার উদ্দেশ্য ছিল বাইরে থেকে কোনো শব্দ যেন ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, কিংবা সেলে কাউকে নির্যাতন করা হলে তার আর্তনাদের আওয়াজ যেন বাইরে না যায়।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, সেখানকার খাবার অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। এজন্য ছয় বছর চার মাস পর্যন্ত তিনি কখনো তিন বেলা খাবার খেতে পারেননি। ডিজিএফআইয়ের ডাক্তারের অব্যাহত চাপের ফলে ২০২৩ সালের শুরু থেকে তিনি তিন বেলা খাবার শুরু করেন। এই দীর্ঘ আট বছর কোনোদিন তৃপ্তি করে পেট ভরে খেতে পারেননি। কখনো এক বেলা খেয়েছেন, কখনো দুই বেলা। খাবার এত নিম্নমানের ছিল যে কখনো কখনো সামান্য ভাত খেয়েই থেকেছেন।

চিকিৎসা সেখানে অত্যন্ত অপ্রতুল ছিল। চোখ, কান, দাঁতের সমস্যাসহ চর্মরোগ ও পেটের পীড়ায় সম্পূর্ণ সময় তাকে ভুগতে হয়েছে। তিনি মোট চারবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তার একিউট কিডনি ইনফেকশন হয়, করোনা হয় ও দুটো দাঁত ভেঙে যায়। তাকে যে টয়লেট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল তা তার সেল থেকে আনুমানিক ৪০-৪৫ কদম দূরে ছিল। টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তারা তাকে হাতকড়া পরাত, চোখ বাঁধতো এবং যমটুপি পরিয়ে নিয়ে যেত। কোনো কোনো সময় চোখ এত জোরে বাঁধতো যে তার চোখের মণিতে প্রচণ্ড ব্যথা করত এবং নাকে এত চাপ লাগত যে শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হতো।

তিনি আরও বলেন, উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় তিনি নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েন। একসময় শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাতেন। কখনো কখনো অবস্থা এত খারাপ হতো যে তাকে একজন বা কখনো দুজন ধরে বিছানা থেকে উঠানো হতো। খাবার সময় তার চেয়ারের পাশে একজন দাঁড়িয়ে থাকত যেন দুর্বলতার কারণে তিনি মাটিতে পড়ে না যান। সেলটি গরমের সময় অত্যন্ত গরম এবং শীতের সময় প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকত। গরমের সময় অতিরিক্ত ঘামানোর ফলে ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স হতো। লবণের ঘাটতি পূরণের জন্য কখনো কখনো তাকে তিন বেলা খাবারের সঙ্গে তিনটা করে লবণের ট্যাবলেট (সোডিক্লোর) খাওনো হতো। ডাক্তার খাবারের সময় কাঁচা লবণও খেতে বলেছিল। সোডিয়াম ঘাটতির জন্য প্রথম ১৩ মাসে রমজান মাস ছাড়া প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচদিন স্যালাইন লাগানো হতো। চোখ বেঁধে রাখার ফলে দুচোখের দুই ধারে এবং গালে ঘা হয়ে গিয়েছিল।

আদালত তার জবানবন্দি শেষ না হওয়ায় অবশিষ্ট অংশের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।