বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে এক ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় করা বিদ্যুৎ চুক্তি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে এই খাতের লোকসান এখন পাহাড়সম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকায়, যা এর আগের অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে প্রায় ৯৪ শতাংশ।
১. ভর্তুকির চাপ ও বাজেট সংকট
বিদ্যুৎ খাতের লোকসান সামাল দিতে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী:
- চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬): এই খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
- বিগত অর্থবছর: অন্তর্বর্তী সরকার বকেয়া দেনা মেটাতে প্রায় ৬০ হাজার ২০০ কোটি টাকা এককালীন ছাড় করেছিল।
- ভবিষ্যৎ শঙ্কা: সংস্কার না হলে আগামীতে ভর্তুকির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে।
২. ‘বিশেষ বিধান’ ও দুর্নীতির জাল
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি। বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে:
- আদানি চুক্তি: ভারতের আদানি পাওয়ারের সাথে করা চুক্তিতে ‘সাংঘাতিক অনিয়ম’ পাওয়া গেছে। কমিটি এই চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন বা প্রয়োজনে বাতিলের পরামর্শ দিয়েছে।
- ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ: বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে, যা গত দেড় দশকে ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
- সুবিধাবাদী চুক্তি: সামিট গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপের মতো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রের ওপর অসম আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
৩. লোকসানের প্রকৃত চিত্র নিয়ে বিভ্রান্তি
বিপিডিবির নিজস্ব অডিট এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যের মধ্যে ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। অডিটে যেখানে লোকসান ১৭ হাজার কোটি টাকা বলা হচ্ছে, সেখানে অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫-এ তা প্রায় ৮ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। এই তথ্য বিভ্রাট বিদ্যুৎ খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
৪. বিদ্যুতের দাম কি বাড়বে?
বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিপিডিবি মনে করছে, এই বিশাল ঘাটতি কমাতে মূল্য সমন্বয় বা দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কমিটির মতে, বিপিডিবিকে টিকিয়ে রাখতে হলে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার দাম বাড়ানোর দায় নিতে চাচ্ছে না। নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
৫. উত্তরণের পথ ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, কেবল আইন বাতিল করলেই হবে না, বরং যেসব চুক্তির কারণে রাষ্ট্রের ‘রক্তক্ষরণ’ হচ্ছে সেগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করতে হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর ও বায়ু) ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিশেষে বলা যায়, বিদ্যুৎ খাতের এই লোকসান কেবল একটি দাপ্তরিক পরিসংখ্যান নয়; এটি সাধারণ জনগণের করের টাকার অপচয়। যদি দ্রুত কঠোর সংস্কার এবং দুর্নীতিগ্রস্ত চুক্তিগুলো বাতিল করা না হয়, তবে এই খাতটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে দেউলিয়া হওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























