ঢাকা ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: সংকট নাকি নতুন স্বাভাবিকতা?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতায় যে ফাটল ধরেছে, তা নির্বাচন পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় প্রদান, সংখ্যালঘু সুরক্ষা নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ এবং সীমান্তে চলমান অস্থিরতা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে এখন এক ধরনের ‘শীতল যুদ্ধ’ বা অস্থিরতা বিরাজ করছে।

সম্পর্কের বর্তমান টানাপড়েন ও সংকটের কেন্দ্রবিন্দু

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভারতের সাথে সম্পর্কের যে অবনতি লক্ষ্য করা গেছে, তা হুট করে মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠী (ICG)-র মতো সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, নির্বাচনের জয়ী হতে রাজনৈতিক দলগুলো ‘ভারতবিরোধী’ আবেগকে ব্যবহার করতে পারে, যা সম্পর্কের তিক্ততা আরও বাড়াতে পারে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান ৫টি বাধা:
১. শেখ হাসিনার অবস্থান ও প্রত্যর্পণ: শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার কর্তৃক তাঁকে ফেরত চাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া দিল্লির জন্য বড় একটি কূটনৈতিক পরীক্ষা হবে।
২. পুশইন ইস্যু: বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত ২,৩৪৪ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করেছে। এটি দ্বিপাক্ষিক আস্থার ক্ষেত্রে বড় আঘাত।
৩. সীমান্ত হত্যা: ফেলানী হত্যার বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ফেলানী হত্যার পর গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএসএফ-এর গুলিতে ১,১৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
৪. একপক্ষীয় নির্ভরতা হ্রাস: অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য তৈরির যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা ভারতের দীর্ঘদিনের একক প্রভাব বলয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
৫. চুক্তি পুনর্বিবেচনা: আদানি গ্রুপের সাথে জ্বালানি চুক্তিসহ বিগত সরকারের বিভিন্ন অসম চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থে আঘাত হানতে পারে।

বিশেষজ্ঞ মতামত: ‘বিগ ব্রাদার সিনড্রোম’ ও সার্বভৌমত্ব

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব:) মনে করেন, ভারত যদি বাংলাদেশকে ‘প্রভাব বলয়ের অংশ’ হিসেবে দেখার মানসিকতা বা ‘বিগ ব্রাদার সিনড্রোম’ ত্যাগ না করে, তবে প্রকৃত বন্ধুত্ব সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সার্বভৌমত্বের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করাই হবে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি। তিনি ৫টি মূল নীতির কথা উল্লেখ করেছেন:

  • সার্বভৌমত্বের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান।
  • সম্পর্ক ব্যক্তি বা দলনির্ভর না হয়ে ‘রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র’ পর্যায়ে স্থিতিশীল করা।
  • অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
  • ভারতের ভূখণ্ডকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে না দেওয়া।
  • জনসম্পৃক্ত আস্থা পুনর্গঠন।

তিস্তা ও অভিন্ন নদীর ন্যায্য অধিকার

তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি দশকের পর দশক ঝুলে আছে। পানি কোনো দয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার। রোকন উদ্দিনের মতে, অভিন্ন নদীগুলোতে ভারতের একতরফা নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। একটি নির্বাচিত সরকার আসার পর এই ন্যায্য পাওনা আদায়ের বিষয়টি নতুন করে টেবিলের সামনে আসবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: ‘রিসেট বাটন’ টেপার সুযোগ

এত নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, একটি নির্বাচিত সরকার আসার পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘রিসেট বাটন’ টেপার সুযোগ তৈরি হবে। ভারতও ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে (যেমন বিএনপি) যোগাযোগ শুরু করেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে দিল্লি কেবল একটি দলের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক রাজনৈতিক শক্তির সাথে স্থিতিশীল সম্পর্কে যেতে আগ্রহী।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জয়ী দল বা জোটকে একদিকে যেমন ভারতের সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একপক্ষীয় নির্ভরতা কমিয়ে একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে হবে। ভারতের জন্যও এটি একটি নৈতিক পরীক্ষা—তারা একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশী হিসেবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করবে কি না।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মাঠের রাজা হলেও যে অপূর্ণতা আজও পোড়ায় মেসিকে

১২ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: সংকট নাকি নতুন স্বাভাবিকতা?

আপডেট সময় : ০১:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতায় যে ফাটল ধরেছে, তা নির্বাচন পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় প্রদান, সংখ্যালঘু সুরক্ষা নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ এবং সীমান্তে চলমান অস্থিরতা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে এখন এক ধরনের ‘শীতল যুদ্ধ’ বা অস্থিরতা বিরাজ করছে।

সম্পর্কের বর্তমান টানাপড়েন ও সংকটের কেন্দ্রবিন্দু

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভারতের সাথে সম্পর্কের যে অবনতি লক্ষ্য করা গেছে, তা হুট করে মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠী (ICG)-র মতো সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, নির্বাচনের জয়ী হতে রাজনৈতিক দলগুলো ‘ভারতবিরোধী’ আবেগকে ব্যবহার করতে পারে, যা সম্পর্কের তিক্ততা আরও বাড়াতে পারে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান ৫টি বাধা:
১. শেখ হাসিনার অবস্থান ও প্রত্যর্পণ: শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার কর্তৃক তাঁকে ফেরত চাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া দিল্লির জন্য বড় একটি কূটনৈতিক পরীক্ষা হবে।
২. পুশইন ইস্যু: বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত ২,৩৪৪ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করেছে। এটি দ্বিপাক্ষিক আস্থার ক্ষেত্রে বড় আঘাত।
৩. সীমান্ত হত্যা: ফেলানী হত্যার বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ফেলানী হত্যার পর গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএসএফ-এর গুলিতে ১,১৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
৪. একপক্ষীয় নির্ভরতা হ্রাস: অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য তৈরির যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা ভারতের দীর্ঘদিনের একক প্রভাব বলয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
৫. চুক্তি পুনর্বিবেচনা: আদানি গ্রুপের সাথে জ্বালানি চুক্তিসহ বিগত সরকারের বিভিন্ন অসম চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থে আঘাত হানতে পারে।

বিশেষজ্ঞ মতামত: ‘বিগ ব্রাদার সিনড্রোম’ ও সার্বভৌমত্ব

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব:) মনে করেন, ভারত যদি বাংলাদেশকে ‘প্রভাব বলয়ের অংশ’ হিসেবে দেখার মানসিকতা বা ‘বিগ ব্রাদার সিনড্রোম’ ত্যাগ না করে, তবে প্রকৃত বন্ধুত্ব সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সার্বভৌমত্বের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করাই হবে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি। তিনি ৫টি মূল নীতির কথা উল্লেখ করেছেন:

  • সার্বভৌমত্বের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান।
  • সম্পর্ক ব্যক্তি বা দলনির্ভর না হয়ে ‘রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র’ পর্যায়ে স্থিতিশীল করা।
  • অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
  • ভারতের ভূখণ্ডকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে না দেওয়া।
  • জনসম্পৃক্ত আস্থা পুনর্গঠন।

তিস্তা ও অভিন্ন নদীর ন্যায্য অধিকার

তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি দশকের পর দশক ঝুলে আছে। পানি কোনো দয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার। রোকন উদ্দিনের মতে, অভিন্ন নদীগুলোতে ভারতের একতরফা নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। একটি নির্বাচিত সরকার আসার পর এই ন্যায্য পাওনা আদায়ের বিষয়টি নতুন করে টেবিলের সামনে আসবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: ‘রিসেট বাটন’ টেপার সুযোগ

এত নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, একটি নির্বাচিত সরকার আসার পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘রিসেট বাটন’ টেপার সুযোগ তৈরি হবে। ভারতও ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে (যেমন বিএনপি) যোগাযোগ শুরু করেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে দিল্লি কেবল একটি দলের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক রাজনৈতিক শক্তির সাথে স্থিতিশীল সম্পর্কে যেতে আগ্রহী।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জয়ী দল বা জোটকে একদিকে যেমন ভারতের সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একপক্ষীয় নির্ভরতা কমিয়ে একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে হবে। ভারতের জন্যও এটি একটি নৈতিক পরীক্ষা—তারা একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশী হিসেবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করবে কি না।