ঢাকা ১২:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

নওগাঁ-৬ আসনে ত্রিমুখী লড়াই: বিদ্রোহী আলমগীরের জনপ্রিয়তায় শঙ্কা, জামায়াতের ফায়দা তোলার চেষ্টা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৩৯:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনে এক জটিল ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। এই আসনে একদিকে যেমন লড়ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজাউল ইসলাম রেজু, তেমনি তাঁর মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর কবির। এই দুই নেতার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভোটের মাঠের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে আসনটি নিজেদের করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. খবিরুল ইসলাম। ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার দলটির ভেতরেই সৃষ্ট বিভেদ ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির এই আসন থেকে তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, এলাকায় সুপরিচিতি এবং গণমানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক তাঁকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছে। তাঁর এই জনভিত্তিই বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজাউল ইসলাম রেজুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বিহারিপুর গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, “আলমগীর কবির এই এলাকার মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। মাঠপর্যায়ে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়, তাই নির্বাচনে তাঁর বিজয়কে কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

আলমগীর কবিরের পক্ষে তাঁর ছোট ভাই ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন বুলু জোরেশোরে প্রচার চালাচ্ছেন। এর জেরে দল থেকে তাঁকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কারের পর ফেসবুক পোস্টে বুলুর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লেখাটি রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য, আনোয়ার হোসেন বুলু ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

নিজের অবস্থান প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী আলমগীর কবির বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমি ভোটের মাঠে কাজ করছি। ‘আত্রাই বাঁচাও, রানীনগর বাঁচাও’—এলাকাবাসীর এমন আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। যারা টাকার ওপর নির্ভর করে নির্বাচন করতে চাইছে, তারা দেশের জন্য ক্ষতিকর। আমি দুর্নীতিমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।” দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি বিদ্রোহী প্রার্থী নাকি জনগণের অরিজিনাল প্রার্থী, তা জনগণই বলবে। আমি তো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই ভোট করছি।”

তবে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর মতে, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে দলটির যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাই ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে যেই আসুক না কেন, মানুষের কাছে তার যথেষ্ট আস্থা গড়ে উঠবে। তাদের বিশ্বাস, এবারের নির্বাচনে ব্যক্তিগত পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার চেয়ে দলীয় প্রার্থিতা এবং প্রতীকই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আত্রাই উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক খোরশেদ আলম বলেন, “দলছুট হয়ে ব্যক্তি ইমেজে ভোট পাওয়ার দিন এখন আর নেই। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী দলকেই দেখেন এবং প্রতীক দেখেই তারা ভোট দেবেন। সুতরাং, বিএনপির বিজয় নিশ্চিত।” জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপন জানান, “আলমগীর কবির দলের কোনো কমিটিতে নেই। আমার জানা মতে তিনি ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী।”

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজাউল ইসলাম রেজু বলেন, “আমরা শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক। আমি দীর্ঘদিন ধরে আত্রাই ও রানীনগরে বিএনপিকে সুসংগঠিত করে রেখেছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। মাঠপর্যায়ে আমার অবস্থান অত্যন্ত ভালো। আমি দুই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে গণসংযোগ করে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখেছি। সুতরাং, ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়।”

আসন্ন নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৪১৬ জন। বিএনপি ও জামায়াত ছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান রতন মোল্লাও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই বহুমুখী লড়াইয়ে কে শেষ হাসি হাসবেন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ছাত্রদলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরুন, অন্যথায় পরিণতি ভয়াবহ হবে: জামায়াত

নওগাঁ-৬ আসনে ত্রিমুখী লড়াই: বিদ্রোহী আলমগীরের জনপ্রিয়তায় শঙ্কা, জামায়াতের ফায়দা তোলার চেষ্টা

আপডেট সময় : ০৮:৩৯:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনে এক জটিল ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। এই আসনে একদিকে যেমন লড়ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজাউল ইসলাম রেজু, তেমনি তাঁর মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর কবির। এই দুই নেতার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভোটের মাঠের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে আসনটি নিজেদের করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. খবিরুল ইসলাম। ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার দলটির ভেতরেই সৃষ্ট বিভেদ ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির এই আসন থেকে তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, এলাকায় সুপরিচিতি এবং গণমানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক তাঁকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছে। তাঁর এই জনভিত্তিই বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজাউল ইসলাম রেজুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বিহারিপুর গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, “আলমগীর কবির এই এলাকার মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। মাঠপর্যায়ে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়, তাই নির্বাচনে তাঁর বিজয়কে কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

আলমগীর কবিরের পক্ষে তাঁর ছোট ভাই ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন বুলু জোরেশোরে প্রচার চালাচ্ছেন। এর জেরে দল থেকে তাঁকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কারের পর ফেসবুক পোস্টে বুলুর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লেখাটি রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য, আনোয়ার হোসেন বুলু ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

নিজের অবস্থান প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী আলমগীর কবির বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমি ভোটের মাঠে কাজ করছি। ‘আত্রাই বাঁচাও, রানীনগর বাঁচাও’—এলাকাবাসীর এমন আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। যারা টাকার ওপর নির্ভর করে নির্বাচন করতে চাইছে, তারা দেশের জন্য ক্ষতিকর। আমি দুর্নীতিমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।” দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি বিদ্রোহী প্রার্থী নাকি জনগণের অরিজিনাল প্রার্থী, তা জনগণই বলবে। আমি তো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই ভোট করছি।”

তবে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর মতে, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে দলটির যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাই ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে যেই আসুক না কেন, মানুষের কাছে তার যথেষ্ট আস্থা গড়ে উঠবে। তাদের বিশ্বাস, এবারের নির্বাচনে ব্যক্তিগত পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার চেয়ে দলীয় প্রার্থিতা এবং প্রতীকই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আত্রাই উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক খোরশেদ আলম বলেন, “দলছুট হয়ে ব্যক্তি ইমেজে ভোট পাওয়ার দিন এখন আর নেই। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী দলকেই দেখেন এবং প্রতীক দেখেই তারা ভোট দেবেন। সুতরাং, বিএনপির বিজয় নিশ্চিত।” জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপন জানান, “আলমগীর কবির দলের কোনো কমিটিতে নেই। আমার জানা মতে তিনি ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী।”

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজাউল ইসলাম রেজু বলেন, “আমরা শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক। আমি দীর্ঘদিন ধরে আত্রাই ও রানীনগরে বিএনপিকে সুসংগঠিত করে রেখেছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। মাঠপর্যায়ে আমার অবস্থান অত্যন্ত ভালো। আমি দুই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে গণসংযোগ করে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখেছি। সুতরাং, ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়।”

আসন্ন নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৪১৬ জন। বিএনপি ও জামায়াত ছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান রতন মোল্লাও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই বহুমুখী লড়াইয়ে কে শেষ হাসি হাসবেন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত।