দেশীয় পণ্যের বিশ্ববাজার তৈরি, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দেশি উদ্যোক্তাদের সেতুবন্ধন এবং রপ্তানি ঝুড়িতে নতুন পণ্য যুক্ত করার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তিন দশক আগে যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই লক্ষ্য থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এই আয়োজন। ৩০তম আসরে এসে মেলাটি এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রদর্শনী অপেক্ষা রাজধানীর মানুষের জন্য নিছক একটি বিনোদন কেন্দ্র ও সাধারণ খুচরা বাজারে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) আয়োজনে প্রতিবছর বড় পরিসরে এ মেলা হলেও একে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। রপ্তানি সংশ্লিষ্টদের মতে, মেলাটি এখন নামেই কেবল ‘আন্তর্জাতিক’, বাস্তবে এটি তার মূল লক্ষ্য থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মেলায় অংশ নিলেও দেশের মাটিতে আয়োজিত এই মেলাটিকে বিশ্বমানের করতে পারছে না ইপিবি। দীর্ঘ যাত্রায় লক্ষ্যচ্যুত এই মেলা এখন শুধুই উৎসবমুখর জনসমাগমের একটি ক্ষেত্র।
সরেজমিনে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর যে গাম্ভীর্য থাকার কথা, তার পরিবর্তে চারদিকে ছড়িয়ে আছে হকারিশৈলী ও বাহারি হাঁকডাক। মেলার পরিবেশ দেখে অনেক সময় রাজধানীর ফুটপাতের বাজারের সঙ্গে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্টলে নিম্নমানের খাদ্যপণ্য ও সাধারণ সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে, যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক দর্শনার্থী। ঢাকার গুলিস্তান, নিউমার্কেট বা ফার্মগেটের ফুটপাতে সচরাচর যেসব সস্তা পণ্য পাওয়া যায়, মেলা প্রাঙ্গণ এখন সেসব পণ্যে সয়লাব। দর্শনার্থীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় এমন হকারি পরিবেশ ও নিম্নমানের পণ্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে স্টল মালিকদের দাবি, মেলায় উৎসবের আমেজ থাকায় ক্রেতা টানতে তারা এমন কৌশল অবলম্বন করছেন।
এদিকে মেলায় ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর রয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম রাখার দায়ে ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে। ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য
১৯৯৫ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবি যৌথভাবে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে প্রথম এই মেলার আয়োজন করে। মূল লক্ষ্য ছিল তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য দেশি পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রচার এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে বড় বড় রপ্তানি আদেশ সংগ্রহ করা। শুরুতে বিদেশি অংশগ্রহণ ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব কিছুটা চোখে পড়লেও ধীরে ধীরে তা সাধারণ ক্রেতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ২০২২ সালে মেলাটি পূর্বাচলের স্থায়ী কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। আধুনিক অবকাঠামো ও বিশাল পরিসর সত্ত্বেও এবারের ৩০তম আসরেও লক্ষ্য পূরণের কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এবারের মেলায় মোট ৩২৪টি স্টলের মধ্যে বিদেশি প্যাভিলিয়ন মাত্র ১১টি। বড় কোনো বিদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের উপস্থিতি এবারও নগণ্য।
রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা
একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত সেখান থেকে অর্জিত রপ্তানি আদেশের পরিমাণ। কিন্তু প্রতিবছর ইপিবির পক্ষ থেকে যে তথ্য দেওয়া হয়, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ স্টলে রপ্তানিযোগ্য মানসম্মত পণ্য নেই। বড় বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এই মেলার চেয়ে বিশেষায়িত মেলাগুলোতে অংশ নিতেই বেশি আগ্রহী। বিজিএমইএ নেতাদের মতে, এই মেলাকে এখন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বিদেশি ক্রেতারা এখানে এসে পণ্য দেখে ক্রয়াদেশ দেবেন—এমন চিত্র এখন আর দেখা যায় না।
বাণিজ্য নাকি বিনোদন?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মেলা এখন ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের জন্য একটি বার্ষিক ভ্রমণের স্থানে পরিণত হয়েছে। পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি ও টুকটাক কেনাকাটার জন্য মানুষ এখানে ভিড় করছেন। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে এবার মেলায় ইলেকট্রিক ও ইনফ্রারেড চুলার ব্যাপক বিক্রি দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরাও স্বীকার করছেন, বিদেশি রপ্তানি আদেশ না পেলেও স্থানীয় খুচরা বিক্রিতে তাদের ভালো মুনাফা হচ্ছে।
ইপিবি কর্মকর্তারা ভিসা জটিলতা, কাস্টমস ও যাতায়াত সমস্যার কথা উল্লেখ করে বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়ানোকে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে দেখছেন। তবে তাদের দাবি, মেলাটি দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। তবে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা, মেলাটি যেন কেবল বিনোদন কেন্দ্র না হয়ে প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ঘুরে দাঁড়ায়।
রিপোর্টারের নাম 

























