দেশের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমকে আরও সুসংহত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নামে একটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যা ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের কেবল গ্রাহক হিসেবে নয়, বরং ব্যাংকের মালিকানা ও অংশীদারিত্বেরও সুযোগ করে দেবে। এই আইন ক্ষুদ্র ঋণ খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ থেকে গতকাল বুধবার এই সংক্রান্ত একটি গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, দেশে ৫০০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ গঠিত হবে। এই ব্যাংকের অন্তত ৬০ শতাংশ মালিকানা সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের হাতে থাকবে। একই সাথে, এই বিশেষ আইনের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে একটি ‘সামাজিক ব্যবসায়’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হবে ব্যক্তিগত লভ্যাংশের পরিবর্তে অর্জিত মুনাফা পুনরায় সামাজিক ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে ব্যয় করা।
ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও মূলধন কাঠামো:
অধ্যাদেশ অনুসারে, বাংলাদেশ ব্যাংকের (লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ) কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার জন্য এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যাবে। ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা এবং প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধন অন্যূন ২০০ কোটি টাকা হতে হবে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এই ব্যাংকের অন্তত ৬০ শতাংশ মূলধন আসবে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে। তবে, দেশে গঠিত কোনো ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ স্টক এক্সচেঞ্জ ব্যবসায় তালিকাভুক্ত হতে পারবে না।
পরিচালনা পর্ষদ:
অধ্যাদেশে ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড নয় সদস্যের হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে চারজন পরিচালক ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। এছাড়াও, তিনজন মনোনীত পরিচালক, দুইজন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং ভোটাধিকারবিহীন একজন পদাধিকারবলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকবেন। কোনো পরিচালক একাদিক্রমে দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
সামাজিক ব্যবসায় ও লভ্যাংশ নীতি:
এই ব্যাংককে একটি ‘সামাজিক ব্যবসায়’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল বিনিয়োগের অতিরিক্ত অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে পাবেন না। তবে, সাধারণ ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে এই বিধিবিধান শিথিলযোগ্য রাখা হয়েছে, যাতে তারা বিনিয়োগের সুফল পেতে পারেন। অবশিষ্টাংশ নিট মুনাফা সামাজিক খাতে ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রধান কার্যাবলী:
নতুন উদ্যোক্তাদের আত্ম-কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে ঋণ প্রদান, আমানত গ্রহণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য ‘উদ্যোগ মূলধন’ প্রদান করা হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিনা ফিতে কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান এবং শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য, গবাদিপশু এবং যন্ত্রপাতির জন্য ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে।
ঋণ আদায়:
খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে এই ব্যাংক ‘অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩’ অনুসরণ করতে পারবে। তবে, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সামাজিক সংবেদনশীলতা রক্ষা করতে হবে এবং কোনো প্রকার জবরদস্তি বা অবমাননাকর পদ্ধতি অবলম্বন করা যাবে না।
নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকরীকরণ:
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে এর পরিচালনা বোর্ড বাতিল বা চেয়ারম্যান/পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা রাখবে। ব্যাংকের সকল কার্যক্রম ‘ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১’ এবং ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি আইন, ২০০৬’ এর সংশ্লিষ্ট বিধানাবলি দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হবে।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটি কার্যকর করার তারিখ নির্ধারণ করবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























