জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ঢাকা মহানগরী, বিশেষ করে মিরপুর এলাকাকে একটি নিরাপদ নগরীতে রূপান্তরিত করা হবে, যেখানে নাগরিকরা জান, মাল ও ইজ্জতের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন। ঢাকা-১৫ আসনের নিজ নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগকালে তিনি এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় উত্তর কাফরুল এলাকা থেকে তার নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়।
গণসংযোগকালে ডা. শফিকুর রহমান একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, মিরপুরসহ পুরো ঢাকা মহানগরীকে একটি নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যেখানে জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা প্রশ্নাতীত থাকবে। তিনি আরও বলেন, সবার জন্য উন্নয়ন নিশ্চিত করে একটি ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যানজটের অভিশাপ থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি, শিশু পার্ক, খেলার মাঠ ও সবুজের সমাহার নিশ্চিত করে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য রাজধানী গড়ার প্রত্যয়ও তিনি জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সকল ধর্মের মানুষ এখানে নিরাপদ থাকবে এবং ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করার মতো পরিবেশ তৈরি করা হবে। আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ আছে এবং থাকবে।”
তিনি মিরপুরকে কেবল ঢাকার একটি অংশ হিসেবে নয়, বরং সংগ্রাম, সাহস ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই মিরপুর আজ অবহেলা, দখলদারি, যানজট, জলাবদ্ধতা, অপরাধ ও অনিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আপনারা ঢাকার বুকে বসবাস করেন, অথচ বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করেন। একটু বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু পানি জমে যায়, রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ড্রেনগুলো পরিষ্কার নেই, খালগুলো দখল হয়ে গেছে। এই দুর্ভোগ কি আপনাদের প্রাপ্য ছিল?”
যানজটকে নিত্যদিনের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাস আছে, কিন্তু শৃঙ্খলা নেই। ফুটপাত দখল হয়ে গেছে, মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামছে। এটি পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনার ফল।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে সঠিক ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনা হবে, বাস রুট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা হবে, ঢাকায় মেট্রোরেলের পরিসর বাড়ানো হবে এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, “যাদের চাঁদা তোলার মানসিকতা রয়েছে, তারা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চাইবে না। জামায়াতে ইসলামীকে আল্লাহ এই অভিশাপ থেকে মুক্ত রেখেছেন।” স্থানীয় রাস্তাগুলোর পরিকল্পিত ও টেকসই সংস্কার এবং জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মিরপুরকে ঢাকার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করার ব্যাপারেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “মা-বোনেরা চলাচলে নিরাপদ বোধ করেন না। ছিনতাই, মাদক, কিশোর গ্যাং—সব মিলিয়ে এক আতঙ্কের পরিবেশ।” তিনি নারীদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন, যেখানে ঘর থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহন—সব জায়গায় নারীরা নিরাপদ থাকবেন। তিনি বলেন, “সকল ধর্মের মানুষ নিরাপদ থাকবে।” প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি, শক্তিশালী কমিউনিটি পুলিশিং চালু করা হবে এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।
মিরপুর-কাফরুল এলাকায় বাড়িভাড়া ও আবাসন সংকটকে প্রকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবার চাপে রয়েছে এবং নিম্নবিত্ত মানুষ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। তিনি উচ্ছেদে বিশ্বাসী নন, বরং নিরাপদ ও মানবিক বস্তি উন্নয়ন এবং সাশ্রয়ী আবাসনের পরিকল্পিত উদ্যোগে বিশ্বাসী। রাস্তায় ময়লার স্তূপ ও দুর্গন্ধের সমস্যা সমাধানে ওয়ার্ডভিত্তিক উন্নত বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা এবং সময়মতো অপসারণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা চালু করার কথা বলেন।
চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির রাজনীতি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে চাঁদার বোঝা চাপিয়ে যারা জনগণের পকেট কাটে, তাদের আর ছাড় দেওয়া হবে না।” নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখা হবে এবং কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
তরুণদের জন্য আইটি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, ফ্রিল্যান্সিং ও আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে, বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তিনি বলেন, “আমরা চাই—মিরপুরের যুবক-যুবতীরা হাত পাতবে না, বরং উদ্যোগী হবে।”
ডা. শফিকুর রহমান একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চান, যেখানে পুরোনো দিনের বস্তাপচা রাজনীতি, পেশিশক্তির রাজনীতি ও সহিংসতার রাজনীতি বন্ধ করে গণমানুষের কল্যাণের রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ানো হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় বিবেচনায় নয়, বরং দেশপ্রেমিক, যোগ্য ও দক্ষ মানুষ দায়িত্ব পাবে। তিনি মিরপুরের জনগণকে সম্মান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
“আসুন, একটি নিরাপদ, মানবিক ও বাসযোগ্য মিরপুর গড়ি। একটি নতুন বাংলাদেশের পথে একসঙ্গে হাঁটি,”—এই আহ্বান জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
রিপোর্টারের নাম 
























