ঢাকা ০৮:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ব্যবসায়ীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন গভর্নর, অর্থনীতির উত্তরণে চাই দক্ষতা ও সুশাসন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৫১:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দেশের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, ব্যবসায়ীরা অতীতে পুতুলের মতো আচরণ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নীরব থেকেছে। বিশেষ করে, গত সরকারের আমলে যখন ঋণের সুদের হার ৬ থেকে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ীরা কেবল সম্মতি জানিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন। অর্থ পাচারের মতো গুরুতর ঘটনাগুলোও তাদের নীরবতা ভঙ্গের কারণ হয়নি। এমন নিষ্ক্রিয়তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে বাধা দেয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মঙ্গলবার ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসি) আয়োজিত ‘ইমপ্লিকেশনস অব এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ফর ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি: বাংলাদেশ পার্সপেকটিভ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে গভর্নর এসব কথা বলেন। আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যাংকাররা অংশ নেন। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেন ব্যবসায়ীরা।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থনীতির প্রতিটি খাতে বাংলাদেশকে এখন প্রস্তুত হতে হবে। তিনি বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করতে নারাজ। বরং বাংলাদেশ এখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ভারতের মতো দেশগুলোর সমমর্যাদার দাবিদার বলে তিনি মন্তব্য করেন। এলডিসি থেকে উত্তরণ অনিবার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই উত্তরণের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন, মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন। তবে কেবল নীতি প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য। লজিস্টিক সিস্টেম, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং শিক্ষা—সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের পাশাপাশি উন্নত স্বাস্থ্যসেবাও এই উত্তরণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছোটখাটো সুবিধার জন্য দীর্ঘমেয়াদী বড় সুবিধা হাতছাড়া করা উচিত হবে না বলে তিনি জোর দেন।

অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ মন্তব্য করেন যে, কেবল মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি কমবে না, কারণ এটি রাজস্বসহ আরও অনেক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, মুদ্রানীতি কঠোর করার ফলে ইতোমধ্যে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন। বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে, যেখানে সরকার নিয়েছে ২৭ শতাংশ, যা ভবিষ্যতে ৩২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়া শুধুমাত্র মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। বর্তমান সরকারকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রভাব সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা একমত হননি। নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে এসব সমস্যার কথা তুলে ধরা প্রয়োজন, অন্যথায় বিষয়টি বুঝতে তাদের অনেক সময় লাগবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নিজেও স্বীকার করেন যে, সুদের হার বর্তমানে বেশি। তবে তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে এক অঙ্কের সুদের হার খুবই বিরল ছিল। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে, যার ফলে অর্থনীতিতে সংকোচন আসা স্বাভাবিক ছিল। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বর্তমানে আমানত প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যা আগে ৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, এখন তা বেড়ে ১১ শতাংশে উঠেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব সুদের হারের ওপর পড়ছে। সুশাসন, তদারকি এবং গ্রাহক আস্থা বাড়লে সুদের হার কমে আসবে। এ জন্য খেলাপি ঋণ কমানো অপরিহার্য, যা মূল্যস্ফীতি কমাতেও সহায়ক হবে।

ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রমে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি জানান, এই সরকারের কাছে একাধিক আইন পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স এবং ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অর্ডিন্যান্স ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। এই আইনগুলোর মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে এবং নয়টি এনবিএফআইকে অবসায়নের দিকে নেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। প্রায় চার মাস আগে এটি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করার জন্য এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক খাতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে গেলে কিছু প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহল সংস্কার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। দেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে এই শক্তিগুলোকে প্রতিহত করতে হবে, অন্যথায় দেশ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লিজেন্ডারি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলেকে শেষ বিদায়

ব্যবসায়ীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন গভর্নর, অর্থনীতির উত্তরণে চাই দক্ষতা ও সুশাসন

আপডেট সময় : ০৫:৫১:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দেশের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, ব্যবসায়ীরা অতীতে পুতুলের মতো আচরণ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নীরব থেকেছে। বিশেষ করে, গত সরকারের আমলে যখন ঋণের সুদের হার ৬ থেকে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ীরা কেবল সম্মতি জানিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন। অর্থ পাচারের মতো গুরুতর ঘটনাগুলোও তাদের নীরবতা ভঙ্গের কারণ হয়নি। এমন নিষ্ক্রিয়তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে বাধা দেয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মঙ্গলবার ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসি) আয়োজিত ‘ইমপ্লিকেশনস অব এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ফর ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি: বাংলাদেশ পার্সপেকটিভ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে গভর্নর এসব কথা বলেন। আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যাংকাররা অংশ নেন। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেন ব্যবসায়ীরা।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থনীতির প্রতিটি খাতে বাংলাদেশকে এখন প্রস্তুত হতে হবে। তিনি বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করতে নারাজ। বরং বাংলাদেশ এখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ভারতের মতো দেশগুলোর সমমর্যাদার দাবিদার বলে তিনি মন্তব্য করেন। এলডিসি থেকে উত্তরণ অনিবার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই উত্তরণের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন, মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন। তবে কেবল নীতি প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য। লজিস্টিক সিস্টেম, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং শিক্ষা—সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের পাশাপাশি উন্নত স্বাস্থ্যসেবাও এই উত্তরণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছোটখাটো সুবিধার জন্য দীর্ঘমেয়াদী বড় সুবিধা হাতছাড়া করা উচিত হবে না বলে তিনি জোর দেন।

অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ মন্তব্য করেন যে, কেবল মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি কমবে না, কারণ এটি রাজস্বসহ আরও অনেক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, মুদ্রানীতি কঠোর করার ফলে ইতোমধ্যে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন। বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে, যেখানে সরকার নিয়েছে ২৭ শতাংশ, যা ভবিষ্যতে ৩২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়া শুধুমাত্র মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। বর্তমান সরকারকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রভাব সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা একমত হননি। নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে এসব সমস্যার কথা তুলে ধরা প্রয়োজন, অন্যথায় বিষয়টি বুঝতে তাদের অনেক সময় লাগবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নিজেও স্বীকার করেন যে, সুদের হার বর্তমানে বেশি। তবে তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে এক অঙ্কের সুদের হার খুবই বিরল ছিল। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে, যার ফলে অর্থনীতিতে সংকোচন আসা স্বাভাবিক ছিল। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বর্তমানে আমানত প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যা আগে ৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, এখন তা বেড়ে ১১ শতাংশে উঠেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব সুদের হারের ওপর পড়ছে। সুশাসন, তদারকি এবং গ্রাহক আস্থা বাড়লে সুদের হার কমে আসবে। এ জন্য খেলাপি ঋণ কমানো অপরিহার্য, যা মূল্যস্ফীতি কমাতেও সহায়ক হবে।

ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রমে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি জানান, এই সরকারের কাছে একাধিক আইন পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স এবং ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অর্ডিন্যান্স ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। এই আইনগুলোর মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে এবং নয়টি এনবিএফআইকে অবসায়নের দিকে নেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। প্রায় চার মাস আগে এটি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করার জন্য এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক খাতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে গেলে কিছু প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহল সংস্কার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। দেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে এই শক্তিগুলোকে প্রতিহত করতে হবে, অন্যথায় দেশ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।