ঢাকা ০২:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

বিদ্যুৎ খাতে নজিরবিহীন অস্থিরতা: ১ বছরে কেন্দ্রভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে খরচ কমিয়ে সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, চুক্তি অনুযায়ী বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়া দিতে হয়, তা এক বছরেই ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এই কেন্দ্রভাড়ার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকায়, যা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা উৎপাদন খরচ বাড়ার পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণকে চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, দেশে সবচেয়ে সস্তা জ্বালানি হিসেবে পরিচিত গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে এবং এর বিপরীতে উচ্চমূল্যের ফার্নেস অয়েল ও কয়লা দিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ডলারের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পিডিবির খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল এবং ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বিল ডলারে হিসাব করা হয়। গত এক বছরে ডলারের দাম ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছানোয় টাকায় পরিশোধিত বিলের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। তৃতীয়ত, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও পিডিবিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছ থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হয়েছে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলো প্রতি লিটার তেল ৭০ টাকায় আমদানি করলেও পিডিবিকে কিনতে হচ্ছে ৮৬ টাকায়।

সরকার গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির ২৫ জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে অন্তত ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বা অলস বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। এই অলস সক্ষমতার জন্যই বছরে প্রায় ১১ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে গচ্চা দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি আদর্শ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় রিজার্ভ মার্জিন বা বাড়তি সক্ষমতা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হওয়া স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশে তা বর্তমানে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিগত সরকারের আমলে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি করায় বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়লেও কেন্দ্রভাড়া বেড়েই চলেছে। সাধারণত ১২ বছরের মধ্যে ঋণের টাকা শোধ হয়ে গেলেও চুক্তির মারপ্যাঁচে ১৩ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত অত্যন্ত উচ্চ হারে ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্র।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, গত গ্রীষ্মে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগের বছরের চেয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে সস্তা উৎস থেকে বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ কমানো চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চ হার কমানোর জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে নতুন করে দর-কষাকষির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে সরাসরি চুক্তি বাতিলের বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ছিল ১১ টাকা ৫৪ পয়সা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ টাকা ৩৪ পয়সায়। অথচ ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য অনেক কম হওয়ায় প্রতি ইউনিটেই সরকারকে বিশাল অংকের লোকসান দিতে হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই পরিস্থিতির জন্য বিগত সরকারের ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়’ ও অপরিকল্পিত নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি মনে করেন, দায়মুক্তি আইন বাতিল হলেও পুরনো অসম চুক্তিগুলো বহাল থাকায় সাধারণ মানুষের ওপর খরচের বোঝা চাপছে। বর্তমানে সরকার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ কমানো এবং বেসরকারি তেলের সার্ভিস চার্জ কমানোর মতো কিছু পদক্ষেপ নিলেও সেগুলোর সুফল পেতে আরও সময়ের প্রয়োজন। পিডিবি গত অর্থবছরেই ৫৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে নিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় বোঝা। দ্রুততম সময়ে কেন্দ্রভাড়া পুনর্নির্ধারণ এবং জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করলে বিদ্যুৎ খাতের এই লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে মতপার্থক্য

বিদ্যুৎ খাতে নজিরবিহীন অস্থিরতা: ১ বছরে কেন্দ্রভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা

আপডেট সময় : ১১:১৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে খরচ কমিয়ে সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, চুক্তি অনুযায়ী বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়া দিতে হয়, তা এক বছরেই ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এই কেন্দ্রভাড়ার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকায়, যা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা উৎপাদন খরচ বাড়ার পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণকে চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, দেশে সবচেয়ে সস্তা জ্বালানি হিসেবে পরিচিত গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে এবং এর বিপরীতে উচ্চমূল্যের ফার্নেস অয়েল ও কয়লা দিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ডলারের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পিডিবির খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল এবং ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বিল ডলারে হিসাব করা হয়। গত এক বছরে ডলারের দাম ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছানোয় টাকায় পরিশোধিত বিলের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। তৃতীয়ত, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও পিডিবিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছ থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হয়েছে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলো প্রতি লিটার তেল ৭০ টাকায় আমদানি করলেও পিডিবিকে কিনতে হচ্ছে ৮৬ টাকায়।

সরকার গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির ২৫ জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে অন্তত ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বা অলস বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। এই অলস সক্ষমতার জন্যই বছরে প্রায় ১১ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে গচ্চা দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি আদর্শ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় রিজার্ভ মার্জিন বা বাড়তি সক্ষমতা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হওয়া স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশে তা বর্তমানে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিগত সরকারের আমলে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি করায় বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়লেও কেন্দ্রভাড়া বেড়েই চলেছে। সাধারণত ১২ বছরের মধ্যে ঋণের টাকা শোধ হয়ে গেলেও চুক্তির মারপ্যাঁচে ১৩ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত অত্যন্ত উচ্চ হারে ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্র।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, গত গ্রীষ্মে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগের বছরের চেয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে সস্তা উৎস থেকে বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ কমানো চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চ হার কমানোর জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে নতুন করে দর-কষাকষির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে সরাসরি চুক্তি বাতিলের বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ছিল ১১ টাকা ৫৪ পয়সা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ টাকা ৩৪ পয়সায়। অথচ ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য অনেক কম হওয়ায় প্রতি ইউনিটেই সরকারকে বিশাল অংকের লোকসান দিতে হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই পরিস্থিতির জন্য বিগত সরকারের ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়’ ও অপরিকল্পিত নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি মনে করেন, দায়মুক্তি আইন বাতিল হলেও পুরনো অসম চুক্তিগুলো বহাল থাকায় সাধারণ মানুষের ওপর খরচের বোঝা চাপছে। বর্তমানে সরকার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ কমানো এবং বেসরকারি তেলের সার্ভিস চার্জ কমানোর মতো কিছু পদক্ষেপ নিলেও সেগুলোর সুফল পেতে আরও সময়ের প্রয়োজন। পিডিবি গত অর্থবছরেই ৫৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে নিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় বোঝা। দ্রুততম সময়ে কেন্দ্রভাড়া পুনর্নির্ধারণ এবং জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করলে বিদ্যুৎ খাতের এই লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।