বৈশাখ মাস বাঙালির জীবনে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই মাস শুধু নতুন বছরের শুরুই নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে এই উৎসব পালিত হয়। শহরে যেখানে নববর্ষকে কেন্দ্র করে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, সেখানে গ্রামবাংলায় মূলত হালখাতা এবং বৈশাখী মেলার মাধ্যমে এর উদযাপন হয়। শহুরে জীবনে ইংরেজি নববর্ষের উদযাপন অনেক সময় বাহ্যিক আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যার সঙ্গে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির যোগসূত্র ক্ষীণ।
অন্যদিকে, বৈশাখে নতুন কাপড় পরা, নারীদের লাল পাড় সাদা শাড়ি এবং পুরুষদের সাদা পাঞ্জাবি পরিধান করা একটি সুন্দর দৃশ্য তৈরি করে। এই সময়ে তাঁতের কাপড়ের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, যা দেশের তাঁতিদের জন্য একটি অর্থনৈতিক সুযোগও বটে। এভাবে বৈশাখ উদযাপন আমাদের সংস্কৃতির পাশাপাশি অর্থনীতিরও একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে, গ্রামবাংলার আসল নববর্ষ উদযাপন শুরু হয় চৈত্র মাসের শেষ দিন, যা চৈত্রসংক্রান্তি নামে পরিচিত। এই দিনটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একাত্মতার প্রতীক। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত এই চর্চার মাধ্যমে মানুষ শরীর ও প্রকৃতির মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করে। চৈত্রসংক্রান্তিতে বিশেষত শাকজাতীয় এবং নিরামিষ খাবার খাওয়ার এক প্রথা রয়েছে, যেখানে প্রাণিজ আমিষ (মাছ, মাংস, ডিম) বর্জন করা হয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি হলো, সারা বছর আমরা যে আবাদি ফসল খাই, চৈত্রসংক্রান্তিতে তার বদলে অনাবাদি শাকসবজি খাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। এর মধ্যে কুড়িয়ে আনা চৌদ্দ রকমের শাক এবং চৈতালি মৌসুমের সবজি, পাতা, মুড়া ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিশেষত গিমা শাক বা তিতা শাক খাওয়ার নিয়ম রয়েছে।
বাংলার কৃষাণি চৈত্রসংক্রান্তিতে ঘরের পাশের আলান-পালান ও মাঠের আনাচে-কানাচে শাক কুড়াতে বের হন। নিয়ম অনুযায়ী, তাঁকে চৌদ্দ রকম অনাবাদি শাক কুড়াতে হয়। এই শাকগুলো রাস্তার ধারে, ক্ষেতের আইলে বা চকে আপনা থেকেই গজানো, যা কেউ আবাদ করেনি। এই মৌসুমে টিকে থাকা এই শাক তোলার অধিকার কৃষাণির। তিনি নিশ্চিত করেন যে, তিনি যে শাক খুঁজছেন তা যেন গ্রামে পাওয়া যায়। ধনী পরিবারের নারীরা হয়তো নিজেরা শাক তুলতে বের হন না, তবে তাঁদের আশপাশেও এই শাকের প্রাচুর্য থাকে।
রিপোর্টারের নাম 





















