ঢাকা ০২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

বিআরটি প্রকল্প নিয়ে মহাবিপাকে সরকার: ভাঙা কিংবা গড়া—সব পথই সংকীর্ণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১১:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

গাজীপুর থেকে ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত বহুল আলোচিত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প নিয়ে এক নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। প্রকল্পটির সময়সীমা ও ব্যয় বাড়ানোর সর্বশেষ প্রস্তাবটিও একনেক সভায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এটি চালু রাখা বা বন্ধ করা—কোনো পথেই সহজ কোনো সমাধান পাচ্ছে না প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ‘ভুল নকশার জঞ্জাল’ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো কার্যকর উপায় না থাকায় চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য এটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

ভাঙা কিংবা গড়া—উভয় পথেই লোকসান: পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ এই প্রকল্পের করুণ দশা বর্ণনা করে জানিয়েছেন, এটি এমন এক স্তরে পৌঁছেছে যে এটি ভেঙে ফেলতেও অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে। আবার বিপুল অর্থ খরচ করে এটি ভেঙে ফেললেও যানজট নিরসনে কোনো টেকসই সমাধান পাওয়া যাবে না। বিআরটি প্রকল্পটি এখন এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে যে এটি বেসরকারি খাতে বাস চলাচলের জন্য ছেড়ে দেওয়ার মতো উপযোগীও নয়। বুয়েটের বিশেষজ্ঞরাও এর কোনো জুতসই সমাধান দিতে পারেননি। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, অথচ জনভোগান্তি কমেনি বিন্দুমাত্র।

বিশেষজ্ঞদের চোখে ‘ভুল পরিকল্পনা’: প্রকল্পের পরামর্শক ও বুয়েট অধ্যাপক ড. সায়ের গফুর এই প্রকল্পটিকে ‘পুরোপুরি ভুল পরিকল্পনা ও ভুল সিদ্ধান্তের’ ফসল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময়ের অপচয় ঘটিয়ে এটি এখন একটি বিরাট জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। তিনি একে একটি ‘ব্যর্থ প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, এর গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ। সম্প্রতি প্রকল্পের নকশাকে ‘বিকট ও অপরিকল্পিত’ বলে একনেক সভায় এর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে বর্তমানে বুয়েট অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হকের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে।

মাঠপর্যায়ে মরণফাঁদ ও অব্যবস্থাপনা: সরেজমিনে দেখা গেছে, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ এখন পথচারী ও যানবাহন চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকল্পের নির্ধারিত লেনে ফেলে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী, যা রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে কিংবা চুরি হয়ে যাচ্ছে। সড়কের মাঝখানে অপরিকল্পিত বাসস্ট্যান্ড ও সিঁড়ি তৈরির ফলে রাস্তার একটি বড় অংশ বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে, যা তীব্র যানজটের প্রধান কারণ। পথচারী পারাপারের ফুটওভার ব্রিজগুলো সরিয়ে ফেলায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অনেক জায়গায় লিফট ও এস্কেলেটরের জন্য তৈরি কাঠামো পলিথিন দিয়ে ঢাকা থাকলেও মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার পথে।

ভবিষ্যৎ কী? অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু মেয়াদের শেষ পর্যায়ে রয়েছে, তাই তারা আর বড় কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না। বর্তমান সরকার চাচ্ছে প্রকল্পের কাজ যতটুকু সম্ভব স্থিতাবস্থায় রেখে একটি বিস্তারিত সুপারিশ পরবর্তী সরকারের কাছে জমা দিতে। সুপারিশে এই ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো ভেঙে অপসারণ করার পরামর্শও থাকতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে, তাদের ওপরই মূলত এই ৫ হাজার কোটি টাকার ‘শ্বেতহস্তী’ বিআরটি-র ভাগ্য নির্ধারণের দায়ভার বর্তাবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে মতপার্থক্য

বিআরটি প্রকল্প নিয়ে মহাবিপাকে সরকার: ভাঙা কিংবা গড়া—সব পথই সংকীর্ণ

আপডেট সময় : ১১:১১:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

গাজীপুর থেকে ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত বহুল আলোচিত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প নিয়ে এক নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। প্রকল্পটির সময়সীমা ও ব্যয় বাড়ানোর সর্বশেষ প্রস্তাবটিও একনেক সভায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এটি চালু রাখা বা বন্ধ করা—কোনো পথেই সহজ কোনো সমাধান পাচ্ছে না প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ‘ভুল নকশার জঞ্জাল’ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো কার্যকর উপায় না থাকায় চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য এটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

ভাঙা কিংবা গড়া—উভয় পথেই লোকসান: পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ এই প্রকল্পের করুণ দশা বর্ণনা করে জানিয়েছেন, এটি এমন এক স্তরে পৌঁছেছে যে এটি ভেঙে ফেলতেও অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে। আবার বিপুল অর্থ খরচ করে এটি ভেঙে ফেললেও যানজট নিরসনে কোনো টেকসই সমাধান পাওয়া যাবে না। বিআরটি প্রকল্পটি এখন এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে যে এটি বেসরকারি খাতে বাস চলাচলের জন্য ছেড়ে দেওয়ার মতো উপযোগীও নয়। বুয়েটের বিশেষজ্ঞরাও এর কোনো জুতসই সমাধান দিতে পারেননি। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, অথচ জনভোগান্তি কমেনি বিন্দুমাত্র।

বিশেষজ্ঞদের চোখে ‘ভুল পরিকল্পনা’: প্রকল্পের পরামর্শক ও বুয়েট অধ্যাপক ড. সায়ের গফুর এই প্রকল্পটিকে ‘পুরোপুরি ভুল পরিকল্পনা ও ভুল সিদ্ধান্তের’ ফসল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময়ের অপচয় ঘটিয়ে এটি এখন একটি বিরাট জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। তিনি একে একটি ‘ব্যর্থ প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, এর গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ। সম্প্রতি প্রকল্পের নকশাকে ‘বিকট ও অপরিকল্পিত’ বলে একনেক সভায় এর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে বর্তমানে বুয়েট অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হকের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে।

মাঠপর্যায়ে মরণফাঁদ ও অব্যবস্থাপনা: সরেজমিনে দেখা গেছে, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ এখন পথচারী ও যানবাহন চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকল্পের নির্ধারিত লেনে ফেলে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী, যা রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে কিংবা চুরি হয়ে যাচ্ছে। সড়কের মাঝখানে অপরিকল্পিত বাসস্ট্যান্ড ও সিঁড়ি তৈরির ফলে রাস্তার একটি বড় অংশ বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে, যা তীব্র যানজটের প্রধান কারণ। পথচারী পারাপারের ফুটওভার ব্রিজগুলো সরিয়ে ফেলায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অনেক জায়গায় লিফট ও এস্কেলেটরের জন্য তৈরি কাঠামো পলিথিন দিয়ে ঢাকা থাকলেও মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার পথে।

ভবিষ্যৎ কী? অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু মেয়াদের শেষ পর্যায়ে রয়েছে, তাই তারা আর বড় কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না। বর্তমান সরকার চাচ্ছে প্রকল্পের কাজ যতটুকু সম্ভব স্থিতাবস্থায় রেখে একটি বিস্তারিত সুপারিশ পরবর্তী সরকারের কাছে জমা দিতে। সুপারিশে এই ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো ভেঙে অপসারণ করার পরামর্শও থাকতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে, তাদের ওপরই মূলত এই ৫ হাজার কোটি টাকার ‘শ্বেতহস্তী’ বিআরটি-র ভাগ্য নির্ধারণের দায়ভার বর্তাবে।