ঢাকা ০২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

মেয়াদের শেষপ্রান্তে অন্তর্বর্তী সরকার: অস্থিরতা ও পদোন্নতির তোড়জোড়ে টালমাটাল প্রশাসন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০৩:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের হাতে সময় আছে আর মাত্র ১৫ দিনের মতো। অথচ মেয়াদের এই শেষলগ্নে এসেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থিরতা ও বিতর্কের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না বর্তমান সরকার। মাঠ প্রশাসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) বদলি করে আবার তা বাতিল এবং নির্বাচনের ঠিক আগে বড় ধরনের পদোন্নতির তোড়জোড় নিয়ে সচিবালয় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।

ইউএনও বদলি ও বাতিলের নাটকীয়তা: গত ২০ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে দেশের আটটি উপজেলার ইউএনও-কে বদলির আদেশ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। নির্বাচন কমিশনের সম্মতিতে ভোলার চরফ্যাশন, চুয়াডাঙ্গার জীবননগরসহ গুরুত্বপূর্ণ আটটি এলাকায় এই রদবদল করা হয়েছিল। কিন্তু এর মাত্র দুদিন পরই, অর্থাৎ ২২ জানুয়ারি আরেকটি প্রজ্ঞাপনে সেই বদলি আদেশ সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। জানা গেছে, একটি রাজনৈতিক দলের আপত্তিতে বদলি করা হলেও পরে অন্য দলের বিরোধিতা ও মাঠ প্রশাসনের অসন্তোষের মুখে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়ার মতে, এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে এবং নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহের উদ্রেক করে।

নির্বাচনের দোরগোড়ায় বড় পদোন্নতি: ভোটের মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও প্রশাসন এখন ব্যস্ত দেড় শতাধিক যুগ্ম-সচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিতে। বিসিএস ২০তম ব্যাচসহ অতীতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের এই তালিকায় রাখা হয়েছে। চলতি মাসেই এই পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। এসএসবির বৈঠকে ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তার নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আনন্দ থাকলেও সাবেক আমলারা একে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে দেখছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব বলেন, “ভোট যখন নাকের ডগায়, তখন এমন সংবেদনশীল কাজ থেকে বিরত থাকাই ভালো। এতে নতুন কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে।”

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন: অদক্ষতা নাকি অযোগ্যতা? সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বর্তমান প্রশাসনকে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম ‘দুর্বল প্রশাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, সরকারের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও রাজনৈতিক চাপ ও কঠিন পরিস্থিতির কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। অন্যদিকে, জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়ার মতে, শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণেই প্রশাসন গত দেড় বছর টালমাটাল ছিল। ডিসি নিয়োগ থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনের রদবদল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা আবার পরিবর্তন করার ঘটনা প্রশাসনের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করেছে।

সচিবালয়ের চিত্র: বর্তমানে সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের চাপা অস্থিরতা বিরাজ করছে। পদোন্নতি প্রত্যাশীরা তদবিরে ব্যস্ত থাকলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এমন বড় রদবদল বা পদোন্নতিকে ভালো চোখে দেখছেন না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই পদোন্নতিকে ‘রুটিন কাজ’ হিসেবে দাবি করলেও নির্বাচনের ময়দানে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে এই প্রশাসনিক রদবদল ও পদোন্নতি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন করবে নাকি নতুন কোনো জটিলতার সৃষ্টি করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে মতপার্থক্য

মেয়াদের শেষপ্রান্তে অন্তর্বর্তী সরকার: অস্থিরতা ও পদোন্নতির তোড়জোড়ে টালমাটাল প্রশাসন

আপডেট সময় : ১১:০৩:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের হাতে সময় আছে আর মাত্র ১৫ দিনের মতো। অথচ মেয়াদের এই শেষলগ্নে এসেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থিরতা ও বিতর্কের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না বর্তমান সরকার। মাঠ প্রশাসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) বদলি করে আবার তা বাতিল এবং নির্বাচনের ঠিক আগে বড় ধরনের পদোন্নতির তোড়জোড় নিয়ে সচিবালয় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।

ইউএনও বদলি ও বাতিলের নাটকীয়তা: গত ২০ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে দেশের আটটি উপজেলার ইউএনও-কে বদলির আদেশ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। নির্বাচন কমিশনের সম্মতিতে ভোলার চরফ্যাশন, চুয়াডাঙ্গার জীবননগরসহ গুরুত্বপূর্ণ আটটি এলাকায় এই রদবদল করা হয়েছিল। কিন্তু এর মাত্র দুদিন পরই, অর্থাৎ ২২ জানুয়ারি আরেকটি প্রজ্ঞাপনে সেই বদলি আদেশ সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। জানা গেছে, একটি রাজনৈতিক দলের আপত্তিতে বদলি করা হলেও পরে অন্য দলের বিরোধিতা ও মাঠ প্রশাসনের অসন্তোষের মুখে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়ার মতে, এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে এবং নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহের উদ্রেক করে।

নির্বাচনের দোরগোড়ায় বড় পদোন্নতি: ভোটের মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও প্রশাসন এখন ব্যস্ত দেড় শতাধিক যুগ্ম-সচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিতে। বিসিএস ২০তম ব্যাচসহ অতীতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের এই তালিকায় রাখা হয়েছে। চলতি মাসেই এই পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। এসএসবির বৈঠকে ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তার নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আনন্দ থাকলেও সাবেক আমলারা একে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে দেখছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব বলেন, “ভোট যখন নাকের ডগায়, তখন এমন সংবেদনশীল কাজ থেকে বিরত থাকাই ভালো। এতে নতুন কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে।”

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন: অদক্ষতা নাকি অযোগ্যতা? সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বর্তমান প্রশাসনকে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম ‘দুর্বল প্রশাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, সরকারের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও রাজনৈতিক চাপ ও কঠিন পরিস্থিতির কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। অন্যদিকে, জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়ার মতে, শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণেই প্রশাসন গত দেড় বছর টালমাটাল ছিল। ডিসি নিয়োগ থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনের রদবদল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা আবার পরিবর্তন করার ঘটনা প্রশাসনের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করেছে।

সচিবালয়ের চিত্র: বর্তমানে সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের চাপা অস্থিরতা বিরাজ করছে। পদোন্নতি প্রত্যাশীরা তদবিরে ব্যস্ত থাকলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এমন বড় রদবদল বা পদোন্নতিকে ভালো চোখে দেখছেন না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই পদোন্নতিকে ‘রুটিন কাজ’ হিসেবে দাবি করলেও নির্বাচনের ময়দানে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে এই প্রশাসনিক রদবদল ও পদোন্নতি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন করবে নাকি নতুন কোনো জটিলতার সৃষ্টি করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।