ঢাকা ০৮:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজির অভিযোগ: ডাকসু-ছাত্রদল দ্বন্দ্বে ঢাবি প্রশাসন, তদন্ত কমিটি গঠন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে ভ্রাম্যমাণ ও ক্ষুদ্র দোকানকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও উচ্ছেদের অভিযোগ ঘিরে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ডাকসু যেখানে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ হাজির করেছে, সেখানে ছাত্রদল অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

রবিবার দুপুরে ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডাকসু কর্তৃপক্ষ ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগসংক্রান্ত ভিডিও, অডিও এবং অন্যান্য নথি প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রদর্শন করে। ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ বলেন, ‘আমরা কারো পতন চাই না, আমরা সংশোধন চাই। যেসব দলের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রত্যাশা ছিল—ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলদারিত্ব থাকবে না।’

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করেন। তারা হলেন—বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইয়েদ হাসান সাদ, সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবিদ আব্দুল্লাহ, রাতুল, কাওসার মাহমুদ এবং সানি সরকার। সর্বমিত্র চাকমা দাবি করেন, দোকান মালিক ও অভিযুক্তদের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। তার ভাষ্যমতে, দোকানটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সেখান থেকে দৈনিক ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আদায়ের পরিকল্পনা ছিল।

এদিকে, এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছে। ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনের স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিতর্কিত ডাকসু নির্বাচনের পর থেকে ক্যাম্পাসে একটি চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে, যা কিছু ডাকসু প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, এই সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা দোকানগুলো ভাঙচুর ও উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘দেড় থেকে দুই মাস আগের একটি ভিডিও কাটছাঁট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগ তৈরি করা হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী জড়িত থাকলে তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে, যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন অভিযোগ আনা হয় এবং অভিযোগের কোনো সত্যতা না পাওয়া যায়, তাহলে দ্রুতই অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এসময় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে দুটি দাবি উত্থাপন করা হয়—ক্যাম্পাসে ক্ষুদ্র ও ভ্রাম্যমাণ দোকান পরিচালনার সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রকাশ এবং তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী, ডাকসু প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

ছাত্রদলের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মিরাজ কোবাদ চৌধুরীকে। অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী প্রক্টর ড. এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী, সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. শান্টু বড়ুয়া এবং সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ভারপ্রাপ্ত এস্টেট ম্যানেজার ফাতেমা বিনতে মুস্তফা। কমিটিকে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তারাগঞ্জে পাচারকালে ৪০০ লিটার পেট্রোল জব্দ, আটক ১

ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজির অভিযোগ: ডাকসু-ছাত্রদল দ্বন্দ্বে ঢাবি প্রশাসন, তদন্ত কমিটি গঠন

আপডেট সময় : ১১:১১:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে ভ্রাম্যমাণ ও ক্ষুদ্র দোকানকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও উচ্ছেদের অভিযোগ ঘিরে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ডাকসু যেখানে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ হাজির করেছে, সেখানে ছাত্রদল অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

রবিবার দুপুরে ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডাকসু কর্তৃপক্ষ ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগসংক্রান্ত ভিডিও, অডিও এবং অন্যান্য নথি প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রদর্শন করে। ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ বলেন, ‘আমরা কারো পতন চাই না, আমরা সংশোধন চাই। যেসব দলের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রত্যাশা ছিল—ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলদারিত্ব থাকবে না।’

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করেন। তারা হলেন—বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইয়েদ হাসান সাদ, সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবিদ আব্দুল্লাহ, রাতুল, কাওসার মাহমুদ এবং সানি সরকার। সর্বমিত্র চাকমা দাবি করেন, দোকান মালিক ও অভিযুক্তদের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। তার ভাষ্যমতে, দোকানটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সেখান থেকে দৈনিক ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আদায়ের পরিকল্পনা ছিল।

এদিকে, এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছে। ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনের স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিতর্কিত ডাকসু নির্বাচনের পর থেকে ক্যাম্পাসে একটি চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে, যা কিছু ডাকসু প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, এই সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা দোকানগুলো ভাঙচুর ও উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘দেড় থেকে দুই মাস আগের একটি ভিডিও কাটছাঁট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগ তৈরি করা হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী জড়িত থাকলে তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে, যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন অভিযোগ আনা হয় এবং অভিযোগের কোনো সত্যতা না পাওয়া যায়, তাহলে দ্রুতই অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এসময় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে দুটি দাবি উত্থাপন করা হয়—ক্যাম্পাসে ক্ষুদ্র ও ভ্রাম্যমাণ দোকান পরিচালনার সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রকাশ এবং তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী, ডাকসু প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

ছাত্রদলের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মিরাজ কোবাদ চৌধুরীকে। অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী প্রক্টর ড. এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী, সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. শান্টু বড়ুয়া এবং সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ভারপ্রাপ্ত এস্টেট ম্যানেজার ফাতেমা বিনতে মুস্তফা। কমিটিকে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।