জনগণের জানমালের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে তল্লাশি চৌকিতে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে দা দিয়ে কোপানো থেকে শুরু করে সুনামগঞ্জে ‘মব’ তৈরি করে পুলিশের মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা এখন নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে সারা দেশে ৬০১টি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১.৬ জন বা প্রায় দুইজন পুলিশ সদস্য পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন। অপরাধ বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে একটি ভয়ংকর ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছরের মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৯৬টি হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০২৪ সালে পুলিশ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৪৩ জন, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও মব জাস্টিস, থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং অপরাধীদের ক্রমবর্ধমান দুঃসাহস পুলিশের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। হালুয়াঘাট, সুনামগঞ্জ, বগুড়া ও চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বা অপরাধীদের আবদার না মানলে সংবদ্ধভাবে পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ে পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ, এজাহার থেকে নাম কাটানো বা থানা থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা পুলিশের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তার মতে, পুলিশ যখনই কারো অন্যায্য দাবি মানছে না, তখনই তারা আক্রমণের শিকার হচ্ছে। নতুন বাস্তবতায় পুলিশ যে ধরণের সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পাওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে তারা বারংবার দোষারোপের শিকার হচ্ছে। এর ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা পালন করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং যারা আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আক্রমণ করছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মামলার ভয় দেখিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়; বরং ‘অপরাধী যেই হোক, ছাড় নেই’—এই বার্তাটি মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করা এবং পুলিশের হারানো নৈতিক শক্তি পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























