২০১৬ সালে অপহৃত হওয়ার পর একটি গোপন কক্ষে আটক থাকাকালীন একটি টেবিলের গায়ে ‘সিটিআইবি’ লেখা দেখেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দিয়েছেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী। সোমবার বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি দেন।
হুম্মাম কাদের চৌধুরী তার জবানবন্দিতে জানান, গত ১৭ বছরের গুমের যে সংস্কৃতি, তিনি নিজেও তার একজন শিকার। ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে সাদাপোশাকের একদল লোক তাকে বংশাল থানায় তুলে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে একটি মাইক্রোবাসে করে মিন্টো রোডে অবস্থিত গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ডিবি কার্যালয়ে থাকাকালীন তিনি টিভিতে দেখতে পান যে তার মা আদালতে প্রবেশ করেছেন এবং তার আইনজীবীরা তাকে আটক রাখার প্রতিবাদ করছেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি টিভিতে দেখেন যে আদালতে তার অনুপস্থিতির কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এ সময় তিনি চিৎকার করে প্রতিবাদ করেন যে, গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে কেন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে।
তিনি আরও জানান, এরপর ডিবি’র মিডিয়া শাখার পরিচালক মনির এক ব্রিফিংয়ে বলেন যে তারা হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে আটক করেননি। টিভিতে এই খবর দেখে তিনি প্রতিবাদ জানালে তার রুমে থাকা টিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে হুম্মাম কাদের বলেন, রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তাকে জানানো হয়, “যাওয়ার সময় হয়েছে।” এরপর তাকে বাইরে নিয়ে একটি ভাঙা মাইক্রোবাসে ওঠানো হয়। গাড়িতে তার পেছনে দুজন, দুই পাশে দুজন এবং ড্রাইভারের পাশে একজন বসা ছিল। গাড়িটি মিন্টো রোড থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দিকে যাত্রা শুরু করে। সামনের ব্যক্তি কাঁদতে কাঁদতে তার কাছে ক্ষমা চাইছিলেন, এতে তিনি ভেবেছিলেন তাকে হয়তো ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছাকাছি পৌঁছালে পেছনের এক ব্যক্তি তাকে চোখ বাঁধতে (ব্লাইন্ড ফোল্ড) বলেন। তিনি কোনো প্রতিবাদ না করে চোখ বাঁধতে দেন। এরপর গাড়িটি মহাখালী ফ্লাইওভার অতিক্রম করে। এ সময় তিনি বুঝতে পারেন যে তারা বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছেন। পাশের ব্যক্তি ফোনে কাউকে জিজ্ঞেস করছিলেন, “আমরা পৌঁছে গেছি, আপনারা কোথায়?” এরপর তাকে “আপনাদের দেখতে পেয়েছি; আমরা আসছি” বলে জানানো হয়।
গাড়িটি একটি কাঁচা রাস্তায় নেমে থেমে যায়। তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে দেওয়া হয় এবং অন্য একটি দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা তাকে অন্য একটি মাইক্রোবাসে তুলে একটি কালো টুপি পরিয়ে দেয়। এ সময় তিনি তার কোমরে একটি অস্ত্রের স্পর্শ অনুভব করেন। গাড়ি চলতে থাকলে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তিনি ভয় পেয়েছেন কিনা, কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি। হঠাৎ করে গাড়ি দুলতে থাকলে তিনি বুঝতে পারেন হয়তো তাকে কোনো সেনানিবাসে নেওয়া হচ্ছে, কারণ সেখানে আঁকাবাঁকা রাস্তা থাকে। কিছুক্ষণ পর গাড়ি থেমে যায় এবং তিনি গাড়ির হর্ন ও একটি পুরোনো গেট খোলার আওয়াজ শুনতে পান। গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করলে তাকে নামিয়ে একটি দেয়ালের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে শরীর তল্লাশি করা হয়।
জম টুপি ওপরে উঠালে তিনি নাক-মুখে বাতাসের স্পর্শ অনুভব করেন। তার মনে হয়েছিল তাকে কোনো স্প্রে করা হয়েছে। এরপর তাকে ভেতরের একটি কক্ষে নিয়ে একটি টুলের উপর বসানো হয়। সেখানে তার মেডিকেল টেস্ট করা হয় এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তিনি কোনো ওষুধ ব্যবহার করেন কিনা। রক্তচাপ মাপার পর তার হ্যান্ডকাপ খুলে দুই হাত পেছনে নিয়ে আবার হ্যান্ডকাপ পরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে তার রাজনৈতিক পরিচয়, পরিবারের জীবিত সদস্যদের নাম জানতে চাওয়া হয়। তাকে ‘র’, আইএসআই বা সিআইএ-এর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ আছে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি অস্বীকার করেন। তখন তার মাথার পেছনে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয় এবং তিনি টুল থেকে নিচে পড়ে যান। তাকে আবার টুলে বসিয়ে মারপিট করা হয়।
বেশ কিছুক্ষণ পর তাকে একটি সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার জম টুপি, ব্লাইন্ড ফোল্ড এবং হ্যান্ডকাপ খুলে দেওয়া হয়। তাকে একটি দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে দাঁড় করিয়ে জামাকাপড় খুলতে বাধ্য করা হয় এবং ছবি তোলা হয়। তিনি প্রতিবাদ করলে তাকে বলা হয়, “এখানে অনেক জায়গা আছে আপনাকে ঝুলিয়ে রাখার।” পরবর্তীতে তারা তাকে একটি লুঙ্গি দিতে চাইলে তিনি বলেন যে তিনি লুঙ্গি পরেন না। তখন তারা তাকে একটি পুরোনো টি-শার্ট এবং ফ্লানেলের প্যান্ট এনে দেয়। তার নিজের পরিধেয় জামাকাপড় নিয়ে যাওয়া হয়।
সেই সেলে তাকে সাত মাস রাখা হয়। সেখানে একটি চৌকি, একটি অটবি টেবিল এবং একটি প্লাস্টিকের চেয়ার ছিল। পরদিন সকালে তাকে নাস্তা দেওয়া হয়। তিনি টেবিলে বসে ডিম খাওয়ার সময় টেবিলের নিচে লাল কালি দিয়ে লেখা ‘সিটিআই’ দেখতে পান। তখন তিনি সিটিআইবি এর অর্থ জানতেন না।
এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার ১০৩ বা ১০৪ ডিগ্রি জ্বর হয়। একজন ব্যক্তি তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন এবং টেবিলের গায়ে ‘সিটিআইবি’ লেখা দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরে সেখান থেকে টেবিলটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি) প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) একটি উচ্চমাত্রার গোপনীয় গোয়েন্দা ইউনিট, যা সিআইএ এবং বিশ্বের অন্যান্য বিশেষ বাহিনীর দ্বারা প্রশিক্ষিত।
রিপোর্টারের নাম 






















