ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের হুমকির মুখে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আরব মিত্র দেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় তারা যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক পথে সংকট নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
ইরানের রাজধানী তেহরানে গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বৃহস্পতিবার ১৯তম দিনে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আন্দোলন ইতোমধ্যে সহিংস রূপ ধারণ করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়ন চালানো হলে ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে ‘জোরালো পদক্ষেপ’ গ্রহণ করবে। তবে ট্রাম্পের এই রণকৌশলের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো।
এদিকে, নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ১৮ দিনের বিক্ষোভে ইরানে অন্তত ৩ হাজার ৪২৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। সংস্থাটি জানায়, ইরানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সূত্র থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাকচি মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই নিহতের সংখ্যাকে ‘ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আরাকচি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে প্রচার করছে যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সামরিক সংঘাতে উসকে দেওয়া যায়। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আড়ালে সুকৌশলে সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে, যারা উগ্রবাদী আইএসের কায়দায় সহিংসতা চালাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য মূলত সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করে দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, তেহরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় আরব মিত্ররা এই সামরিক আগ্রাসনের ঘোর বিরোধী। তাদের আশঙ্কা, ইরানে কোনো ধরনের হামলা শুরু হলে পুরো অঞ্চলটি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার মুখে পড়বে। এতে দেশগুলোর নিরাপত্তা যেমন বিঘ্নিত হবে, তেমনি ব্যবসা ও পর্যটনের ‘নিরাপদ গন্তব্য’ হিসেবে তাদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে নানা বিষয়ে বিরোধ থাকলেও সৌদি আরব সরাসরি কোনো যুদ্ধ চায় না। আরব দেশগুলো মনে করছে, ইরানে কোনো সামরিক হামলা বা শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন মূলত ইসরাইলকে এই অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করবে। কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক বদর আল-সাইফ এ প্রসঙ্গে জানান, ইরানে হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থের অনুকূলে নয়। এটি কেবল ইসরাইলের জন্য অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য তৈরি করবে, যা আরব বিশ্বের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
সংকট নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত ওমান ইতোমধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, দোহা পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আলোচনার মাধ্যমেই এই অঞ্চলের বড় চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করা সম্ভব। এছাড়া সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও অভিন্ন সুরে কূটনৈতিক উপায়ে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, বিশেষ সূত্রের মাধ্যমে তিনি ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়ার খবর পেয়েছেন। তবে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
রিপোর্টারের নাম 






















