চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে যে দ্রুতই এআই শিখে নিতে হবে, সে বিষয়ে কারোরই কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই যাত্রায় কাঠামোগত মানদণ্ড তৈরি করাই সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শক্তিশালী ডেটা গভর্ন্যান্স আইন, নিয়মিত এআই অডিট এবং স্পষ্ট নৈতিক কাঠামো ছাড়া কোনো রূপান্তরই টেকসই হবে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে এআই বাস্তবায়নের বাস্তব চিত্র বুঝতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতায় নজর দিলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে এআই বাস্তবায়ন খুব একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক প্রোডাক্ট অ্যাপ্লিকেশন নির্বাচন করা। বর্তমানে অনেক কারখানার মেশিন আইওটির মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া অনলাইন মনিটরিংয়ের আওতায় থাকলেও, মেশিনের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশাধিকারের অনুমোদন পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে এআই ভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পমালিকদের মানসিকতা এবং স্থানীয় প্রযুক্তির প্রতি আস্থার অভাব একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ করা তুলনামূলকভাবে বেশি কঠিন। কারণ সামান্য বিনিয়োগও এই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দৈনন্দিন পরিচালনার মূলধন হয়ে দাঁড়ায় এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা তাদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল। যদিও এআই শিল্পখাতে স্বচ্ছতা আনে, তবে এটি শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর ভয়ও তৈরি করে। এআই বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বড় ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিল্পখাতকে বোঝার জন্য ডেটা ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও ব্যবহারের নীতিগত কাঠামো প্রয়োজন। পাশাপাশি শিল্পখাতে ইন্টারনেট সংযোগের উচ্চমূল্য এবং ডেটা সংরক্ষণের খরচ কমানোর জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন করা প্রয়োজন, যা ভবিষ্যতে এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এআই গ্রহণ সহজতর করবে।
শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিল্পখাতে এআই গ্রহণ যত দ্রুত বাড়ছে, সেই তুলনায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কাঠামো এখনো পিছিয়ে আছে। গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্পের সংযোগ এখনো কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ নেয়নি। গবেষকদের প্রধান সংকট হলো স্থানীয় ডেটার অভাব, আর শিল্পখাতের সংকট হলো সময়ের সীমাবদ্ধতা। এই সংকট কাটাতে ব্যাংক বা টেলিকম কোম্পানিগুলো যদি তাদের তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেয়, তবে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যার সমাধান বের করতে পারবে। এছাড়া উন্নত দেশের মতো ‘কো-অপ’ মডেল প্রয়োগ করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝেই দীর্ঘ সময় শিল্পখাতে কাজ করে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। বর্তমান পাঠ্যসূচি শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং রিসোর্সের অভাবও একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
ইউনেস্কোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এআই অগ্রগতির পথে সংকটগুলো বিচ্ছিন্ন নয় বরং কাঠামোগত। জাতীয় এআই নীতি এখনো খসড়া পর্যায়ে থাকায় দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি স্পষ্ট নয়। স্বাধীন ডেটা প্রোটেকশন ও সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অভাব এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে এবং ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকের ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এআই বিপ্লব অপেক্ষা করে না। বাংলাদেশ যদি এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে আগামী কয়েক বছরে শুধু শিল্প নয়, মেধার বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। পোশাক শিল্প একসময় যেমন অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল, ভবিষ্যতে সেই জায়গা দখল করবে এআই-তে দক্ষ মানবসম্পদ।
রিপোর্টারের নাম 























