২০২৬ সালে ইয়েমেনে ক্ষমতার ভারসাম্যে আবারও নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। এক মাসের তীব্র সংঘর্ষের পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার, যা প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি) নামে পরিচিত, বিচ্ছিন্নতাবাদী দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)-এর কাছ থেকে দুটি কৌশলগত দক্ষিণ প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। এই সাম্প্রতিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্রতম এই দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত এসটিসি সৌদি সীমান্তবর্তী তেলসমৃদ্ধ হাদরামাউত ও আল-মাহরা প্রদেশের দখল নেয়। সৌদি আরব এই পদক্ষেপকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য “লাল রেখা” হিসেবে আখ্যা দেয় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় পিএলসিকে সমর্থন করে এসটিসি’র অবস্থানগুলোতে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায়। এসব হামলার মধ্যে দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ মুকাল্লা বন্দরও ছিল। উল্লেখ্য, ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে পিএলসি ও এসটিসি দীর্ঘদিন ধরে মিত্র হিসেবে লড়াই করে এলেও, তাদের মধ্যকার এই নতুন সংঘর্ষ ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইয়েমেনে বর্তমানে তিনটি প্রধান শক্তি নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তার করছে, যারা দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে:
প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি)
সৌদি আরব-সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই শাসক পরিষদ ২০২২ সাল থেকে রাশাদ আল-আলিমির নেতৃত্বে এডেন থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। হুথি-বিরোধী শক্তিগুলোকে একত্রিত করার লক্ষ্যে গঠিত এই পরিষদ থেকে ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি এসটিসি নেতৃত্বকে বহিষ্কার করা হয়। পিএলসি’র মূল লক্ষ্য হলো ইয়েমেনের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়াদি পরিচালনা করা এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)
সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত এসটিসি দক্ষিণ ইয়েমেনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। জানুয়ারিতে তাদের নেতা আইদারুস আল-জুবাইদিকে পিএলসি থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে রিয়াদে এসটিসি’র বিলুপ্তি ঘোষণার খবর এলেও, সংগঠনটি তা প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখে। বর্তমানে সৌদি আরব দক্ষিণ ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছে, যা এসটিসি’র ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
হুথি বিদ্রোহীরা (আনসার আল্লাহ)
ইরান-সমর্থিত হুথিরা রাজধানী সানাসহ উত্তর ও পশ্চিম ইয়েমেনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা এবং হোদেইদাহ বন্দর দখলে রেখে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে তারা ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে এবং ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও করেছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
স্বাধীন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর তথ্য অনুযায়ী, হুথিরা উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেন নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে সরকার দেশের বাকি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ দাবি করে। যদিও দক্ষিণের কিছু এলাকায় এখনও এসটিসি বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। সরকার ঘোষণা করেছে যে, হুথি-বিরোধী সব বাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত করা হবে, তবে এই প্রক্রিয়াটি এখনও শুরু হয়নি।
এক দশকের দীর্ঘ সংঘাত ইয়েমেনকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর মানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে অন্তত ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য ঘাটতিতে ভুগছে। সংস্থাটি আরও জানায়, ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ৪৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সংকট বা জরুরি পর্যায়ের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। প্রায় ২ কোটি মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, এবং ২০১৫ সাল থেকে ৪৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইউনিসেফ-এর মতে, সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট এবং ভেঙে পড়া সেবাব্যবস্থার কারণে ইয়েমেনের লাখ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে, যা দেশটির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ফেলছে।
রিপোর্টারের নাম 






















