ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের একটি বেদুইন গ্রাম এখন বাস্তুচ্যুতির করুণ দৃশ্যের সাক্ষী। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও আগ্রাসনের মুখে রাস আইন আল-আউজা গ্রামের বাসিন্দারা তাদের ভেড়ার খোঁয়াড় ভেঙে ফেলছেন, মালপত্র ট্রাকে তুলছেন এবং চিরতরে এলাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কার্যকর আইন-শৃঙ্খলার অভাবে এই আধা-যাযাবর জনগোষ্ঠী নিজেদের ভিটেমাটি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পশ্চিম তীরজুড়ে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, আধা-যাযাবর বেদুইন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গ্রামের ১৩০টি পরিবারের প্রায় অর্ধেক ইতোমধ্যে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত সপ্তাহে কা’বনেহ গোত্রের অন্তত ২০টি পরিবার গ্রাম ছেড়েছে এবং আরও প্রায় ৫০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি খুলে ফেলছে। স্থানীয়রা জানান, বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামের আশেপাশে নিজেদের ট্রেলার স্থাপন করছে, যা ধীরে ধীরে স্থায়ী আবাসে রূপান্তরিত হচ্ছে। এর কিছু আবার বেদুইনদের বসতবাড়ি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত।
রাস আইন আল-আউজা গ্রামের বাসিন্দা ফারহান জাহালিন গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, গত দুই বছর ধরে বসতি স্থাপনকারীদের নিরবচ্ছিন্ন হামলায় তাদের পুরো সম্প্রদায় ভেঙে পড়েছে। তার ভাষায়, “এই অবিরাম চাপের মুখে আমাদের গ্রামে আর টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।”
১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর দখলের পর থেকে সেখানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে পাঁচ লাখেরও বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, অল্প সংখ্যক বসতি স্থাপনকারী চরম সহিংসতার মাধ্যমে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সংখ্যা রেকর্ড ২৬০টিতে পৌঁছেছিল, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করে। জাহালিনের সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও তীব্র হয়েছে।
বেদুইনদের অভিযোগ, বসতি স্থাপনকারীরা তাদের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন পানির উৎস বন্ধ করে দিচ্ছে। গত বছরের মে মাসে তারা গ্রামের প্রধান ঝর্ণা থেকে পানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, সেচ পাইপ ভেঙে ফেলা এবং নিজেদের পশু বেদুইনদের ঘরের কাছাকাছি চরানোর মাধ্যমে তারা স্থানীয়দের মধ্যে ভয় ও চাপ সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নাইফ জায়েদ বলেন, “আমরা যদি নিজেদের ঘর রক্ষা করতে যাই, তাহলে পুলিশ বা সেনাবাহিনী এসে আমাদের গ্রেপ্তার করে। আমাদের কিছু করার নেই।” তিনি আরও জানান, বাস্তুচ্যুত মানুষজন কোথায় যাবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট পথ খুঁজে পাচ্ছে না।
অধিকাংশ ফিলিস্তিনি বেদুইন পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। বসতি স্থাপনকারীরা যখন নিজেদের পশু চরাতে আসে, তখন জমি ও খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং সহিংসতার আশঙ্কা তীব্র হয়। বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো এই কৌশলকে ‘পশুপালনভিত্তিক উপনিবেশবাদ’ হিসেবে অভিহিত করছে, যার লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে বিতাড়িত করা।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা রাস আল-আইন এলাকায় সংঘটিত ঘটনাগুলো সম্পর্কে অবগত এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার পর এলাকায় সেনা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানানো হয়।
তবে বেদুইনদের আশঙ্কা, এক এলাকা ছেড়ে অন্য গ্রামীণ অঞ্চলে গেলেও ভবিষ্যতে আবারও বাস্তুচ্যুত হতে হবে। জাহালিন উল্লেখ করেন, পাশের জিফতলিক গ্রামের কিছু পরিবার একাধিকবার স্থানচ্যুত হওয়ার উদাহরণ তাদের সামনে রয়েছে। পশ্চিম তীরের সড়কগুলোতে সম্প্রতি আরবিতে লেখা “ফিলিস্তিনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই” স্লোগান দেখা যাচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে রাস আইন আল-আউজায় বসবাসকারী জাহালিনের মতে, এই বাক্যই তাদের বর্তমান বাস্তবতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে।
তিনি আরও বলেন, “বসতি স্থাপনকারীরা বেদুইন জীবনধারা ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় মুছে ফেলার সব ধরনের চেষ্টা চলছে।”
রিপোর্টারের নাম 






















