ঢাকা ০৯:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের প্রাণঘাতী থাবা: শরীয়তপুরে দেড় ঘণ্টা আটকা পড়ে বৃদ্ধের মৃত্যু, ফের ক্ষোভ

শরীয়তপুরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বাধার কারণে গুরুতর অসুস্থ এক বৃদ্ধ রোগীকে ঢাকায় নেওয়ার পথে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এই প্রাণঘাতী বিলম্বের কারণে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা গেছেন স্ট্রোক আক্রান্ত ওই বৃদ্ধ। গত ছয় মাসের মধ্যে একই কারণে এটি দ্বিতীয় প্রাণহানির ঘটনা হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

সর্বশেষ ঘটনায়, জমশেদ আলী ঢালী (৭০) নামের ওই রোগীকে একাধিক স্থানে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার ফলে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়, যা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে দাবি করেছে পরিবার।

মঙ্গলবার সকালে শরীয়তপুর সদর উপজেলার কুতুবপুর এলাকার বাসিন্দা জমশেদ আলী ঢালী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে সকাল ৯টার দিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তার শরীরে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখতে পেয়ে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।

পরিবারের সদস্যরা প্রথমে সাড়ে ৬ হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করেন। কিন্তু রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পর স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য আরও ২ হাজার টাকা দাবি করেন। অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা রোগীকে ঢাকায় নিতে বাধা দেন। পরে পরিবারের পরিচিত ঢাকাগামী একটি অ্যাম্বুলেন্স ৫ হাজার টাকায় ভাড়া করা হয়।

সিন্ডিকেটের বাধা এড়াতে সদর হাসপাতাল এলাকা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে চৌরঙ্গী মোড় থেকে রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। তবে যাত্রা শুরুর মাত্র ১০ মিনিট পর সদর উপজেলার প্রেমতলা এলাকায় স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালক, হেলপার ও মালিকদের একটি দল রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি আটকায়। কিছুক্ষণ আটকে রাখার পর স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে গাড়িটি ছাড়া পায়।

এরপর পুনরায় জাজিরা উপজেলার জামতলা এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে দ্বিতীয় দফা অ্যাম্বুলেন্সটি থামানো হয়। সেখানে চালক ও হেলপারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এই দুই দফা বাধায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। অবশেষে বিকেল ৩টার দিকে ঢাকার বাংলামোটর এলাকায় পৌঁছানোর আগেই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই জমশেদ আলী ঢালী মারা যান। পরে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃতের নাতি জোবায়ের হোসেন রোমান বলেন, “আমার নানাকে সময়মতো ঢাকায় নিতে পারলে হয়তো বাঁচানো যেত। শুধু বেশি টাকা না দেওয়ার কারণে বারবার অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয়েছে। যারা এ কাজ করেছে, তাদের কঠোর শাস্তি চাই।”

অ্যাম্বুলেন্সের চালক মো. সালমান অভিযোগ করে বলেন, “ঢাকা থেকে রোগী নিতে এলে স্থানীয় সিন্ডিকেটকে ২ থেকে ৪ হাজার টাকা কমিশন দিতে হয়। অনুমতি ছাড়া রোগী তুললেই বাধা দেওয়া হয়। জমশেদ নামের ওই রোগীকে নেওয়ার সময় আমাদের দুই জায়গায় আটকে মারধর করা হয়েছে। এসব কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা দেরি হয়।”

এ বিষয়ে পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম জানান, “রোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক খন্দকার রাশেদ আহমেদ নিশ্চিত করেন, “রোগীর উচ্চ রক্তচাপ ছিল এবং বারবার বমি হচ্ছিল। স্ট্রোকের লক্ষণ থাকায় তাকে দ্রুত নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।”

শরীয়তপুর অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল হাই মোল্লা বলেন, “কোনো রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। যদি স্থানীয় কোনো অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তা ঘৃণিত কাজ এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৪ আগস্ট শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর এলাকায় কম ভাড়ার অন্য জেলার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করায় সিন্ডিকেটের বাধার মুখে পড়ে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় মামলা ও তদন্ত কমিটি গঠন হলেও ছয় মাস না পেরোতেই ফের একই অভিযোগে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় জেলায় তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এমন অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের প্রাণঘাতী থাবা: শরীয়তপুরে দেড় ঘণ্টা আটকা পড়ে বৃদ্ধের মৃত্যু, ফের ক্ষোভ

আপডেট সময় : ১০:৪১:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

শরীয়তপুরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বাধার কারণে গুরুতর অসুস্থ এক বৃদ্ধ রোগীকে ঢাকায় নেওয়ার পথে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এই প্রাণঘাতী বিলম্বের কারণে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা গেছেন স্ট্রোক আক্রান্ত ওই বৃদ্ধ। গত ছয় মাসের মধ্যে একই কারণে এটি দ্বিতীয় প্রাণহানির ঘটনা হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

সর্বশেষ ঘটনায়, জমশেদ আলী ঢালী (৭০) নামের ওই রোগীকে একাধিক স্থানে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার ফলে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়, যা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে দাবি করেছে পরিবার।

মঙ্গলবার সকালে শরীয়তপুর সদর উপজেলার কুতুবপুর এলাকার বাসিন্দা জমশেদ আলী ঢালী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে সকাল ৯টার দিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তার শরীরে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখতে পেয়ে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।

পরিবারের সদস্যরা প্রথমে সাড়ে ৬ হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করেন। কিন্তু রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পর স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য আরও ২ হাজার টাকা দাবি করেন। অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা রোগীকে ঢাকায় নিতে বাধা দেন। পরে পরিবারের পরিচিত ঢাকাগামী একটি অ্যাম্বুলেন্স ৫ হাজার টাকায় ভাড়া করা হয়।

সিন্ডিকেটের বাধা এড়াতে সদর হাসপাতাল এলাকা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে চৌরঙ্গী মোড় থেকে রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। তবে যাত্রা শুরুর মাত্র ১০ মিনিট পর সদর উপজেলার প্রেমতলা এলাকায় স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালক, হেলপার ও মালিকদের একটি দল রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি আটকায়। কিছুক্ষণ আটকে রাখার পর স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে গাড়িটি ছাড়া পায়।

এরপর পুনরায় জাজিরা উপজেলার জামতলা এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে দ্বিতীয় দফা অ্যাম্বুলেন্সটি থামানো হয়। সেখানে চালক ও হেলপারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এই দুই দফা বাধায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। অবশেষে বিকেল ৩টার দিকে ঢাকার বাংলামোটর এলাকায় পৌঁছানোর আগেই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই জমশেদ আলী ঢালী মারা যান। পরে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃতের নাতি জোবায়ের হোসেন রোমান বলেন, “আমার নানাকে সময়মতো ঢাকায় নিতে পারলে হয়তো বাঁচানো যেত। শুধু বেশি টাকা না দেওয়ার কারণে বারবার অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয়েছে। যারা এ কাজ করেছে, তাদের কঠোর শাস্তি চাই।”

অ্যাম্বুলেন্সের চালক মো. সালমান অভিযোগ করে বলেন, “ঢাকা থেকে রোগী নিতে এলে স্থানীয় সিন্ডিকেটকে ২ থেকে ৪ হাজার টাকা কমিশন দিতে হয়। অনুমতি ছাড়া রোগী তুললেই বাধা দেওয়া হয়। জমশেদ নামের ওই রোগীকে নেওয়ার সময় আমাদের দুই জায়গায় আটকে মারধর করা হয়েছে। এসব কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা দেরি হয়।”

এ বিষয়ে পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম জানান, “রোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক খন্দকার রাশেদ আহমেদ নিশ্চিত করেন, “রোগীর উচ্চ রক্তচাপ ছিল এবং বারবার বমি হচ্ছিল। স্ট্রোকের লক্ষণ থাকায় তাকে দ্রুত নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।”

শরীয়তপুর অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল হাই মোল্লা বলেন, “কোনো রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। যদি স্থানীয় কোনো অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তা ঘৃণিত কাজ এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৪ আগস্ট শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর এলাকায় কম ভাড়ার অন্য জেলার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করায় সিন্ডিকেটের বাধার মুখে পড়ে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় মামলা ও তদন্ত কমিটি গঠন হলেও ছয় মাস না পেরোতেই ফের একই অভিযোগে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় জেলায় তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এমন অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।