ঢাকা ০৯:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

বিতর্কের মুখে পোস্টাল ব্যালট: জালিয়াতি ও পক্ষপাতের অভিযোগে উত্তপ্ত রাজনীতি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা নিয়ে শুরুতেই বড় ধরনের বিতর্ক ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবারই প্রথম প্রবাসী ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ‘আইটি-নির্ভর’ পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে ভোট শুরুর আগেই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বিরোধী দল বিএনপির তীব্র আপত্তি এই ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের ব্যালট পেপার একদল ব্যক্তির হাতে পাওয়া যাওয়া এবং ব্যালটে প্রতীকের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা।

পোস্টাল ব্যালটের পরিসংখ্যান ও আসনভিত্তিক প্রভাব: ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবার মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১৫৫ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই (৭.৬ লক্ষাধিক) প্রবাসী ভোটার। বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তত ১৮টি আসনে ১০ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট রয়েছে, যা অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়া আসনগুলোর ফলাফল পাল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিশেষ করে ফেনী-৩ আসনে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৯৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন, যা ফল নির্ধারণে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

বিতর্কের মূলে থাকা প্রধান বিষয়সমূহ:

বাহরাইন ভিডিও কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির অভিযোগ: অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, বাহরাইনের একটি বাসায় বসে কয়েকজন ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ পোস্টাল ব্যালট হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন এবং সেগুলো গুনছেন। এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিএনপি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দলটির দাবি, সেখানে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতারা এই ব্যালটগুলো ‘হ্যান্ডল’ করছেন, যা সরাসরি নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা বাহরাইন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং ডাককর্মীদের কাছ থেকে সব ব্যালট একত্রে বুঝে নেওয়ার এই ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতীক বিন্যাসে ‘কৌশলগত’ পক্ষপাতের অভিযোগ: বিএনপির পক্ষ থেকে ইসিতে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে যে, বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে যাতে একটি নির্দিষ্ট দলের নেতার সুবিধা হয়। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ব্যালট পেপারে এমনভাবে প্রতীক সাজানো হয়েছে যে কয়েকটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক সবার উপরে এসেছে, অথচ বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকটি মাঝখানে এমনভাবে রাখা হয়েছে যে কাগজ ভাঁজ করলে সেটি নজরেই পড়ে না। একে তারা ‘কৌশলগত পক্ষপাতিত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে ইসি এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, প্রতীকের নামের আদ্যাক্ষর (অ্যালফাবেটিক্যালি) অনুযায়ী ১১৯টি প্রতীক বিন্যাস করা হয়েছে এবং এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।

গোপনীয়তা ভঙ্গের ঝুঁকি ও এনআইডি ব্লকের হুঁশিয়ারি: পোস্টাল ব্যালট আগেভাগে হাতে পেয়ে ভোট দেওয়ার পর তা প্রকাশ্যে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা বা ছবি তুলে রাখা হলে নির্বাচনি গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, কেউ যদি পোস্টাল ব্যালটের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করা হতে পারে। তা ছাড়া, ১৫ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে কত শতাংশ ব্যালট সময়মতো কেন্দ্রে ফিরে আসবে, তা নিয়েও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কারণ অতীতে পোস্টাল ব্যালট নষ্ট হওয়ার হার ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্যরা মনে করছেন, পোস্টাল ভোট কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোনো একটি দলের পক্ষে গণহারে পড়লে তা জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে এবং পরবর্তীতে পরাজিত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ ওঠার পথ প্রশস্ত করবে। ইসি অবশ্য দাবি করেছে, তারা সব প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করছে এবং বাহরাইনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ-তুরস্ক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর: বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে তুর্কি রাষ্ট্রদূতের বৈঠক

বিতর্কের মুখে পোস্টাল ব্যালট: জালিয়াতি ও পক্ষপাতের অভিযোগে উত্তপ্ত রাজনীতি

আপডেট সময় : ০১:৫০:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা নিয়ে শুরুতেই বড় ধরনের বিতর্ক ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবারই প্রথম প্রবাসী ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ‘আইটি-নির্ভর’ পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে ভোট শুরুর আগেই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বিরোধী দল বিএনপির তীব্র আপত্তি এই ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের ব্যালট পেপার একদল ব্যক্তির হাতে পাওয়া যাওয়া এবং ব্যালটে প্রতীকের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা।

পোস্টাল ব্যালটের পরিসংখ্যান ও আসনভিত্তিক প্রভাব: ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবার মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১৫৫ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই (৭.৬ লক্ষাধিক) প্রবাসী ভোটার। বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তত ১৮টি আসনে ১০ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট রয়েছে, যা অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়া আসনগুলোর ফলাফল পাল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিশেষ করে ফেনী-৩ আসনে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৯৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন, যা ফল নির্ধারণে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

বিতর্কের মূলে থাকা প্রধান বিষয়সমূহ:

বাহরাইন ভিডিও কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির অভিযোগ: অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, বাহরাইনের একটি বাসায় বসে কয়েকজন ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ পোস্টাল ব্যালট হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন এবং সেগুলো গুনছেন। এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিএনপি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দলটির দাবি, সেখানে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতারা এই ব্যালটগুলো ‘হ্যান্ডল’ করছেন, যা সরাসরি নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা বাহরাইন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং ডাককর্মীদের কাছ থেকে সব ব্যালট একত্রে বুঝে নেওয়ার এই ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতীক বিন্যাসে ‘কৌশলগত’ পক্ষপাতের অভিযোগ: বিএনপির পক্ষ থেকে ইসিতে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে যে, বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে যাতে একটি নির্দিষ্ট দলের নেতার সুবিধা হয়। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ব্যালট পেপারে এমনভাবে প্রতীক সাজানো হয়েছে যে কয়েকটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক সবার উপরে এসেছে, অথচ বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকটি মাঝখানে এমনভাবে রাখা হয়েছে যে কাগজ ভাঁজ করলে সেটি নজরেই পড়ে না। একে তারা ‘কৌশলগত পক্ষপাতিত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে ইসি এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, প্রতীকের নামের আদ্যাক্ষর (অ্যালফাবেটিক্যালি) অনুযায়ী ১১৯টি প্রতীক বিন্যাস করা হয়েছে এবং এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।

গোপনীয়তা ভঙ্গের ঝুঁকি ও এনআইডি ব্লকের হুঁশিয়ারি: পোস্টাল ব্যালট আগেভাগে হাতে পেয়ে ভোট দেওয়ার পর তা প্রকাশ্যে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা বা ছবি তুলে রাখা হলে নির্বাচনি গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, কেউ যদি পোস্টাল ব্যালটের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করা হতে পারে। তা ছাড়া, ১৫ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে কত শতাংশ ব্যালট সময়মতো কেন্দ্রে ফিরে আসবে, তা নিয়েও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কারণ অতীতে পোস্টাল ব্যালট নষ্ট হওয়ার হার ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্যরা মনে করছেন, পোস্টাল ভোট কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোনো একটি দলের পক্ষে গণহারে পড়লে তা জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে এবং পরবর্তীতে পরাজিত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ ওঠার পথ প্রশস্ত করবে। ইসি অবশ্য দাবি করেছে, তারা সব প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করছে এবং বাহরাইনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।