জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে হত্যার দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডাদেশের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ৪৫৩ পৃষ্ঠার এই রায়ে জুলাই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা নির্দেশ ও উসকানির বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দাবি শোনার পরিবর্তে তাঁদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে অপমান করে উসকে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে শেখ হাসিনার ফাঁস হওয়া ফোনালাপকে ট্রাইব্যুনাল অপরাধের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য করেছেন। সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষিত ওই ফোনালাপে শেখ হাসিনাকে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে শোনা যায়।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয় যে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ‘ছাত্রলীগই যথেষ্ট’—এমন বক্তব্যের পর সারা দেশে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা শুরু করে। এই আক্রমণেরই ধারাবাহিকতায় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, অভিভাবক হিসেবে শেখ হাসিনা চাইলে খুব সহজেই আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করতে পারতেন, কিন্তু তিনি আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার পথ বেছে নিয়েছিলেন। আদালত কক্ষে প্রদর্শিত ভিডিও ও সাক্ষীদের জবানবন্দিতে উঠে আসা নৃশংসতার বর্ণনা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ের প্রধান দিকসমূহ:
- দণ্ডাদেশ: শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ।
- আইজিপির সাজা: সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি ‘রাজসাক্ষী’ হয়ে সত্য প্রকাশ করায় আদালত তাঁর প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করেছেন।
- আদালতের মন্তব্য: এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো সাবেক সরকারপ্রধানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজা দেওয়ার নজির।
- ক্ষতিপূরণ: জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবার এবং গুরুতর আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ গত ১৭ নভেম্বর এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছিলেন। বর্তমানে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংসতা রোধে এই রায় একটি মাইলফলক হিসেবে থাকবে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।
রিপোর্টারের নাম 

























