আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ নাক, কান ও গলা। শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ, কথা বলা, শ্রবণ এবং খাদ্য গ্রহণের মতো মৌলিক কাজগুলো এই অঙ্গগুলোর সুস্থতার উপর নির্ভরশীল। সামান্য অসাবধানতা বা ভুল অভ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণ হতে পারে। তবে, কিছু সহজ এবং সচেতনতামূলক অভ্যাস অবলম্বনের মাধ্যমে নাক, কান ও গলার অনেক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
১. কান পরিষ্কারে সতর্কতা অপরিহার্য
কটন বাড বা অন্য কোনো ধারালো বস্তু দিয়ে কান খোঁচানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে কানের অভ্যন্তরে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে এবং এমনকি কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। প্রকৃতপক্ষে, কানের ময়লা বা ওয়াক্স একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা কানকে জীবাণু ও ধূলিকণা থেকে সুরক্ষা দেয় এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে বাইরে নিষ্কাশিত হয়। গোসলের পর কেবল একটি পরিষ্কার তোয়ালে বা নরম কাপড় দিয়ে কানের বাহ্যিক অংশ মুছে নেওয়াই যথেষ্ট; কানের গভীরে কিছু প্রবেশ করানোর প্রয়োজন নেই।
২. উচ্চস্বরে কথা বলা বর্জন করুন
অতিরিক্ত জোরে কথা বলা বা চিৎকার করার অভ্যাস কণ্ঠনালীর উপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে ভোকাল কর্ডে নোডিউল বা পলিপ সৃষ্টি হতে পারে, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে সার্জারিরও প্রয়োজন হতে পারে। যারা পেশাগত কারণে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন, তাদের কণ্ঠস্বরের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া উচিত।
৩. সুপারি, জর্দা ও গুল সেবন পরিহার করুন
সুপারি এবং তামাকজাত দ্রব্য মুখগহ্বর ও গলার ক্যান্সারের একটি প্রমাণিত কারণ। নিয়মিত এই দ্রব্যগুলো সেবন করলে মুখ, জিহ্বা এবং গলার মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এই ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো ত্যাগ করাই সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার প্রথম এবং প্রধান শর্ত।
৪. উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন
দীর্ঘক্ষণ ধরে উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহার করলে শ্রবণশক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পায় এবং অকাল শ্রবণশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়। হেডফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘৬০-৬০’ নিয়মটি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি: ভলিউম যেন ৬০ ডেসিবেলের বেশি না হয় এবং একটানা ব্যবহার যেন ৬০ মিনিটের বেশি না হয়। এই নিয়ম মেনে চললে কানের ক্ষতি থেকে অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব।
৫. ধূমপান সম্পূর্ণরূপে বর্জন করুন
ধূমপান নাক, কান, গলা সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্যান্সার সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। এটি কণ্ঠস্বর, শ্বাসনালী এবং ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে। একটি সুস্থ জীবন যাপনের জন্য ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা অপরিহার্য।
৬. নাকের হাড় বাঁকা বা মাংস বৃদ্ধি বিষয়ে সচেতনতা
অনেক মানুষের ক্ষেত্রে নাকের মাঝের হাড় কিছুটা বাঁকা থাকে অথবা নাকের ভেতরের মাংসল অংশ (টার্বিনেট) সামান্য বড় হয়, যা অনেক সময় স্বাভাবিক। তবে, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, ঘন ঘন সাইনাস সংক্রমণ, দীর্ঘস্থায়ী নাক বন্ধ থাকা বা নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘকাল ধরে নাকের ড্রপ ব্যবহার করলে তা নাকের ভেতরের ঝিল্লির স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
৭. টনসিল প্রদাহ হলেই অস্ত্রোপচার নয়
টনসিলের সংক্রমণ বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যকবারের বেশি না হলে এবং অস্ত্রোপচারের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ না হলে সার্জারির প্রয়োজন হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়মিত ও সঠিক চিকিৎসায় টনসিলের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। ঠান্ডা খাবার পরিহার এবং ঈষৎ উষ্ণ পানিতে কুলকুচি করলে অনেক সময় অস্ত্রোপচার ছাড়াই উপকার পাওয়া যায়।
৮. অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা থেকে সাবধান
নাকের সমস্যায় অপ্রচলিত বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার আশ্রয় নিলে নাকের অভ্যন্তরে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে নাকের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, উভয় দিক একসাথে লেগে যাওয়া (সাইনেকিয়া) অথবা নাকের মাঝের পর্দায় ছিদ্র তৈরি হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, নাকের ভেতরে অ্যাসিড বা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ‘অপারেশন ছাড়াই স্থায়ী সমাধান’—এমন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা না দেওয়াই শ্রেয়।
৯. অ্যালার্জিক রাইনাইটিস থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ
বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক চুলকানোর মতো উপসর্গগুলোকে অবহেলা করা উচিত নয়। নাকের অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ম মেনে চলা জরুরি। অ্যালার্জির সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ধুলোবালি, ঠান্ডা, নির্দিষ্ট কিছু খাবার এবং বিভিন্ন প্রকার গন্ধ (যেমন কয়েলের ধোঁয়া, সুগন্ধি বা বডি স্প্রে)। তবে, ব্যক্তিভেদে অ্যালার্জির কারণ ভিন্ন হতে পারে।
১০. ঘাড়ে ফোলা বা চাকা হলে অবহেলা নয়
গলা বা ঘাড়ের যেকোনো ফোলা বা চাকা ব্যথাহীন হলেও তা অবহেলা করা উচিত নয়। এটি লিম্ফ গ্রন্থির সংক্রমণ, যক্ষ্মা (টিবি), টিউমার বা গলগণ্ডসহ বিভিন্ন রোগের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেরি না করে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা এবং সঠিক চিকিৎসাই সুস্থতার চাবিকাঠি। নাক, কান বা গলার কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং ঠান্ডা পরিহার—এই অভ্যাসগুলো নাক, কান ও গলার সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
রিপোর্টারের নাম 

























