বর্তমান সময়ে দ্রুত ওজন কমাতে বিশ্বজুড়ে এক নতুন উন্মাদনা তৈরি করেছে ‘স্লিমিং ইনজেকশন’। বিশেষ করে সেমাগ্লুটাইড ও তিরজেপাটাইড সমৃদ্ধ ইনজেকশনগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ওজন কমানোর জাদুকরী সমাধান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে এই পদ্ধতির এক অন্ধকার দিক। দেখা গেছে, ইনজেকশন নেওয়া বন্ধ করার পর রোগীদের ওজন কমার বদলে তা আরও দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করে, যা সাধারণ ডায়েট ও ব্যায়াম করা ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। এই প্রবণতা দ্রুত ওজন কমানোর স্থায়ীত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এই ইনজেকশনগুলো মূলত ‘জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট’ শ্রেণির ওষুধ। এগুলো শরীরে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের মতো কাজ করে কৃত্রিমভাবে তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে। এর ফলে পাকস্থলীর খাবার হজমের গতি ধীর হয়ে যায় এবং ব্যক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম খাবার গ্রহণ করেন। ফলশ্রুতিতে স্বল্প সময়ে ওজন কমে ঠিকই, কিন্তু এই পরিবর্তন মূলত ওষুধনির্ভর। এখানে রোগীর জীবনধারা বা খাদ্যাভ্যাসের কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটে না।
সমস্যাটি প্রকট হয় যখন কেউ ইনজেকশন নেওয়া বন্ধ করে দেন। ওষুধ বন্ধের সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের হরমোনাল ভারসাম্য আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। এতে হঠাৎ করে ক্ষুধা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং খাবারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়। অন্যদিকে, শরীরের বিপাকীয় হার বা মেটাবলিক রেট প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ায় শুরু হয় ‘রিবউন্ড ওয়েট গেইন’। অর্থাৎ, যে ওজনটুকু কষ্ট করে কমানো হয়েছিল, তা খুব অল্প সময়েই ফিরে আসে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা আগের ওজনের সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়। এটি একদিকে যেমন ব্যক্তিকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে, অন্যদিকে শরীরের ওপর ফেলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়েট ও শরীরচর্চার মাধ্যমে যারা ওজন কমান, তাদের প্রক্রিয়াটি ধীর হলেও টেকসই। কারণ এই দীর্ঘ সময়ে ব্যক্তির মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের একটি স্থায়ী অভ্যাস গড়ে ওঠে। ফলে ওজন ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে যৎসামান্য। বিপরীতে, ইনজেকশননির্ভর পদ্ধতিতে জীবনযাত্রায় কোনো গুণগত পরিবর্তন না আসায় ওষুধ বন্ধের পর শরীর পুনরায় পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্থূলতা কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। তাই স্লিমিং ইনজেকশনকে কোনোভাবেই জাদুকরী বা তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চিকিৎসকরা বলছেন, এই ইনজেকশন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার অংশ হতে পারে, তবে তা অবশ্যই বিশেষজ্ঞের নিবিড় তত্ত্বাবধানে হতে হবে। হুট করে এটি বন্ধ করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করাও চরম বোকামি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও ভয়াবহ। দেশে বর্তমানে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে এসব ইনজেকশন ব্যবহার করছেন। স্থূলতার সঙ্গে হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ও উচ্চ রক্তচাপের গভীর সম্পর্ক থাকায়, এসব ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভবিষ্যতে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিশেষে, স্লিমিং ইনজেকশন সাময়িকভাবে ওজন কমাতে সহায়ক মনে হলেও এটি কোনো স্থায়ী বা নিরাপদ সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত কায়িক পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। ওজন কমানোর লড়াইয়ে প্রকৃত জয় তখনই সম্ভব, যখন কৃত্রিম ওষুধের পরিবর্তে সুস্থ জীবনধারার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।
রিপোর্টারের নাম 

























